ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্বনেতৃত্বের বাংলাদেশ সফর

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্বনেতৃত্বের বাংলাদেশ সফর

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২১ | ১৯:০৮ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫:৫৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনকে কেন্দ্র করে ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা জাতীয়ভাবে উদযাপনে নতুন মাত্রা দিয়েছে বিশ্বনেতৃত্বের অংশগ্রহণ। সাধারণত কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছাড়া একসঙ্গে এত নেতাকে সাধারণত আমরা দেখি না। বাংলাদেশ এবার এই নজির তৈরি করেছে। একদিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতৃত্বের বাংলাদেশে আগমন এবং অনেকের ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ আমাদের জন্য বহুমুখী সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রথমেই বলা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, তেমনি পররাষ্ট্রনীতিরও প্রবক্তা। বঙ্গবন্ধুর 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়'- এই পররাষ্ট্রনীতি এখনও বাংলাদেশের কূটনীতির বড় শক্তির জায়গা। মাত্র সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আজকের সমৃদ্ধির বাংলাদেশ সেই শক্তিশালী  ভিতেরই বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্ম সেই ইতিহাস জানার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ১০ দিনের আয়োজনে আমরা দেখছি ইতোমধ্যে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম মু. সালিহ, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী বাংলাদেশে এসেছেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিংও ইতোমধ্যে ঢাকায় এসেছেন। আর ২৬ মার্চ উপস্থিত থাকবেন প্রতিবেশী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে ভিডিওতে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইউশিহিদে সুগা। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী চুং স্যু-কুয়েন শুভেচ্ছা বার্তা দেবেন। এত সংখ্যক বিশ্বনেতৃত্বের অংশগ্রহণে বাংলাদেশের উদযাপন ও বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ আমাদের জন্য গৌরবের। আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে আসার আগে লন্ডনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। দিল্লিতে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ১০ জানুয়ারি এখনও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ, ন্যাম প্রভৃতি বিশ্ব সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ওই সময়ে তাকে বিশ্বে যেমন জনপ্রিয়তা দিয়েছে, তেমনি আজকের দিনেও বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর সে অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
বাংলাদেশের আয়োজনে বিশ্বনেতৃত্বের অংশগ্রহণের সুযোগ আমরা নানাভাবে কাজে লাগাতে পারি। আমরা জানি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে বাংলাদেশের ওপর যে গণহত্যা পরিচালিত হয়, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রচেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের যে সমর্থন প্রয়োজন, আমি মনে করি, বিশ্বনেতৃত্ব এখানে আসার ফলে তারা যখন বিষয়টি দেখবেন, তাদের মাধ্যমেও এ স্বীকৃতি সহজ হবে।
একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া বাংলাদেশের যে উন্নয়ন হচ্ছে; এখানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থার যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা বিশ্বনেতৃত্ব সফরের মাধ্যমে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এমনিতেই সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে বাংলাদেশ নানা কর্মকাণ্ডে প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক আশ্রয় একটা বড় বিষয়। এখানে নারীর অগ্রগতি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, শিক্ষায় নারীর অগ্রযাত্রা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা বাংলাদেশের সোচ্চার কণ্ঠ এবং নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনীতিও অনেকের জন্য ঈর্ষার কারণ।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ নেতৃত্বের আসনে রয়েছে। করোনা মোকাবিলাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য এ অঞ্চলে আমাদের অবস্থান সংহত করেছে। এমনকি প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্কের কারণে অতীতের ভুল সত্ত্বেও পাকিস্তানও চাচ্ছে আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে।
বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ আগমনের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধা হয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন। আমরা দেখেছি মালদ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশের চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। নেপালের সঙ্গেও চারটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও যুব উন্নয়ন, কৃষি, কারিগরি শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ছয়টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব চুক্তির ফলে সংশ্নিষ্ট দেশ যেমন লাভবান হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশও উপকৃত হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় এ সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো জরুরি।
বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের দুই বড় শক্তি ভারত এবং চীন উভয়ের অংশগ্রহণ আমরা দেখছি। ভিডিও বার্তায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুরও প্রশংসা করে বলেন, ৫০ বছর আগে বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলাদেশের জনগণ তাকে গভীর ভালোবাসায় এখনও স্মরণ করে। এ ছাড়া চীনের জনগণের পুরোনো এবং ভালো বন্ধু ছিলেন তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এবারের সফরের প্রধান উদ্দেশ্য বাংলাদেশের আয়োজনে একাত্মতা প্রকাশ হলেও এর গুরুত্ব কম নয়। দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে একই আয়োজনে যুক্ত করাও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন বাংলাদেশকে তুলে ধরা এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশ বিশ্বনেতৃত্বকে সরাসরি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্বনেতৃত্ব নিশ্চয়ই এটা অনুধাবন করার সুযোগ পাচ্ছেন- বাংলাদেশ যেখানে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রতিবেশী মিয়ানমার যাচ্ছে পেছনের দিকে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সেখানে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন দমাতে মানুষ হত্যা করছে। তারা রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করেছে। দেশটি দিন দিন বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের দিক থেকে আমরা এক ধরনের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা দেখছি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে যারা অংশগ্রহণ করছেন, কেবল তারাই নন বরং অন্য রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানও নিঃসন্দেহে তা পর্যবেক্ষণ করছেন। এত বিশ্বনেতৃত্বের সফর ও তাদের অংশগ্রহণও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতার পরিচায়ক। একই সঙ্গে সবাইকে উষ্ণ আতিথেয়তা ও যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা করার মাধ্যমে প্রতিরক্ষায় আমাদের শক্তিও দৃশ্যমান।
আমরা জানি বঙ্গবন্ধু শুধু উপমহাদেশে নয়, বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষেও তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। বাংলাদেশের বাইরেও এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার অপর নাম ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল বিস্ময়কর। তার ৭ মার্চের ভাষণের সম্মোহনী শক্তি এখনও মানুষ অনুভব করে; যা ইউনেস্কোও স্বীকৃতি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন করে যে শক্তিশালী ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, ওই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আজ আমরা সমৃদ্ধির গান গাইছি।
বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বিশ্বনেতৃত্বকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পেয়েছি। এ উৎসব আয়োজন ভবিষ্যতে আরও উজ্জ্বলতর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×