মোদির মন্দির দর্শন ও ভোটের রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গ
সফরে গিয়ে সেখানকার মন্দির দর্শন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের বাংলাদেশ সফরসূচিতে দুটি মন্দিরের অন্তর্ভুক্তি ভারতজুড়ে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, একটি যখন 'শিডিউল কাস্ট' মতুয়া জনগোষ্ঠীর তীর্থক্ষেত্র।
মোদির সমালোচকরা মনে করছেন, সফরসূচিতে এই মন্দিরের অন্তর্ভুক্তি পশ্চিমবঙ্গে চলমান বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জন্য হিন্দু ভোট সংহত করতে সহায়ক হবে। যদিও এই অনুমানের যৌক্তিকতা বিতর্কযোগ্য। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী মোদি পাদপ্রদীপের আলো টেনে নিতে পেরেছেন। ভোটের ভরা মৌসুমে সবচেয়ে বড় প্রচার তারকাকে দুই দিনের বাংলাদেশ সফরের জন্য ছেড়ে দিয়ে এটাই বিজেপির সম্ভবত সবচেয়ে বড় লাভ।
বাস্তবে প্রথম কথা হচ্ছে, এই সফর ও বিধানসভা নির্বাচনের সময় মিলে যাওয়ার ক্ষেত্রে মোদির ভূমিকা সামান্যই। বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছে নিজের নিয়মে। এ উপলক্ষে ঘোষিত ১০ দিনের কর্মসূচির সমাপনী অধিবেশনে আমন্ত্রিত হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এই সফর নেহাত সৌজন্যের; প্রথাগত দ্বিপক্ষীয় সফর নয়। দ্বিপক্ষীয় বড় কোনো বিষয়ে চুক্তি বা সমঝোতার সম্ভাবনাও তাই নেই বললেই চলে। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি অভিন্ন স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা করবেন। বিশেষত বাংলাদেশের দিক থেকে তিস্তার পানি বণ্টনের মতো অভিন্ন সম্পদ ভাগাভাগির ইস্যু তোলার চেষ্টা স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির মুখে এটি দীর্ঘ দিন ঝুলে রয়েছে।
শুধু ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বা বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগগুলোর জন্যই নয়; অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আসাম যে স্থিতিশীল- এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ সত্ত্বেও স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের কিছু উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এ দুটি বিষয়ের প্রভাব সীমান্তের অন্য পাশেও রয়েছে। এটা সত্য, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ সবচেয়ে নিরাপদ সময় পার করেছে। কিন্তু এটাও সত্য, বিদ্যমান ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করার যে কোনো সুযোগই উগ্রপন্থিরা ছেড়ে দেবে না। সুনামগঞ্জে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভ সেটিই মনে করিয়ে দেয়।
শুরুর কথায় ফিরি; প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের জন্য যশোরেশ্বরী কালীমন্দির বেছে নেওয়ার বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক। মন্দিরটি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত। এ জেলার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্ত রয়েছে। যশোরেশ্বরী মন্দির এ কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে, নিভৃত ওই পল্লি এক সময় মহারাজা প্রতাপাদিত্যের (১৫৬১-১৬১১) রাজধানী ছিল। অবিভক্ত বাংলা ও আসামের বারোভূঁইয়ার অন্যতম এই যোদ্ধা-জমিদার মোগল সম্রাটদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। কলকাতাসহ দক্ষিণ বাংলার বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল তার রাজ্য।
অবশ্য ইতিহাসের এই অংশ আজকের বিভক্ত বাংলায় মনে রাখা হয় না বললেই চলে এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এর শূন্য প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর বড়জোর স্থানীয়দের আবেগে হাওয়া দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে মন্দিরটির পর্যটন আকর্ষণ হয়ে ওঠার পথ খুলে যেতে পারে।
নরেন্দ্র মোদির অন্য আরেকটি গন্তব্য গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দির মতুয়া মন্দির। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি এই জেলা মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরেরও জন্মস্থান। নিম্নবর্গীয় হিন্দু সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে ১৮৬০ সালের দিকে তিনি এ সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। দেশভাগের পর মতুয়াদের বৃহত্তর অংশ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এখন পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ শিডিউল কাস্টের উল্লেখযোগ্য অংশ এই মতুয়া জনগোষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম ভোটব্যাংক মোকাবিলায় মতুয়ারা হতে পারে বিজেপির বৃহত্তম বাজি।
দেশ বিভাগের অনেক বছর পরও মতুয়ারা পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি যেত ফাল্কগ্দুন মাসে 'মহাবারুণী স্নান' উৎসবে যোগ দিতে। প্রসঙ্গত, একই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে 'বারুণী স্নান' বা গঙ্গাস্নান করে থাকেন হিন্দু পুণ্যার্থীরা। পরে অবশ্য ওড়াকান্দিতে ভারত থেকে আসা পুণ্যার্থীর ঢল ক্রমে কমতে থাকে। এর একটি কারণ, উভয় দেশ থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব। অন্য কারণ পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁর ঠাকুরনগরে মতুয়াদের বিকল্প তীর্থকেন্দ্র গড়ে ওঠা।
হতে পারে, প্রধামন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ সফর মতুয়া পুণ্যার্থীদের মধ্যে ভারত থেকে ওড়াকান্দি যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি করবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে এর বড় ধরনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। কারণ মতুয়াদের সংখ্যাগুরু অংশ ইতোমধ্যে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বনগাঁ আসনে দলটির বিজয়ের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়েছে।
বস্তুত, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই ভারতে নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা সিএএ পাস হওয়ার পর মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজেপির আসন পোক্ত হয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর মতো তারাও এখন সিএএ বাস্তবায়নের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কারণ এই আইনের বাস্তবায়ন স্পষ্টত তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা দূর করবে।
মোট কথা, বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দুটি বিশেষ মন্দির দর্শন নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার পালে হাওয়া দেবে।
কিন্তু সরাসরি ব্যালট বাক্সে এর খুব বেশি প্রভাব নাও থাকতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক; ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'নিউজ এইটিন' থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তরিত
