বাবুইয়ের জীবনের বাঁকে মানুষের দুঃখরেখা
প্রতিবেশ
করোনা মহামারিকালে ইতালির রোম শহরে এবার ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়ে আতশবাজি পোড়ানোর কারণে শত শত পাখির প্রাণহানি ঘটেছিল। প্রাণী অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সংগঠন আইওপিএ রোম শহরের ওই ঘটনাকে 'গণহত্যা'র সঙ্গে তুলনা করে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। নিকট অতীতে ভারতের রাজস্থানের বহুল পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র সম্ভর হ্রদে কয়েক হাজার পরিযায়ী পাখির মৃত্যু ঘটে। এর কাছাকাছি সময়ে রাজস্থানেরই আলওয়ার জেলার সাগর হ্রদে আরও কিছু পরিযায়ী পাখির প্রাণহানি ঘটে। দু'দফায় রাজস্থানের এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এত পরিযায়ী পাখির আকস্মিক মৃত্যুকে স্থানীয় অনেকেই 'হত্যাকাণ্ড' বলে দাবি করেন। কিছু পাখির ভিসেরা পাঠানো হয় ভোপালের পরীক্ষাগারে।
ইতালির রোম ও ভারতের রাজস্থানের দূরত্ব যোজন যোজন হলেও সংবেদনশীল মানুষদের উচ্চারণে কোনো পার্থক্য দেখা গেল না। সম্প্রতি আমাদের দেশে আক্রোশের আগুনে পুড়ে যায় বাবুইপাখির বাসা ও অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণহানি ঘটে অনেক বাবুইছানার। এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে ৯ এপ্রিল ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ভৈরবপাশা ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামে। সমকালে সচিত্র প্রতিবেদনে ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা যে কোনো সংবেদনশীল মানুষকে বেদনাহত করতে বাধ্য। ওই পাখি হন্তারককে সংশ্নিষ্ট উপজেলার 'দয়ালু' ইউএনও ক্ষমা করে দিয়েছেন! নলছিটির ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই ১০ এপ্রিল পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে দুই শতাধিক ছানা মেরে ফেলার পাশাপাশি ভেঙে ফেলা হয় অনেক বাবুইপাখির বাসা। ইন্দুরকানীর ইউএনও হোসাইন মোহাম্মদ আল মুজাহিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন 'ব্যবস্থা' নেওয়া হবে।
প্রকৃতির শিশু বা সন্তান পাখিদের এভাবে যারা হত্যা করল, বাসা ভেঙে ফেলল, তারা সুস্থ মনের মানুষ নয়। পাখির প্রতিও সমাজের অনেকের নিজেদের সন্তানের মতোই মমতামাখা অনুভূতি রয়েছে। কারণ শিশুরা যেমন সারল্যের অনুভূতি জাগায়, অনেকের মাঝেই পাখির ক্ষেত্রেও সেরকম অনুভূতি জাগে। ইতালির রোম ও ভারতের রাজস্থানের অনেক মানুষ ফের এই নজিরই স্থাপন করলেন। অনেকেরই মনে থাকার কথা, আমাদের সমাজে 'পাখি' নামের পোশাকের জন্য আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এই যে এতগুলো পাখি 'গণহত্যা'র শিকার হলো, তা আমাদের সমাজে ক'জনের অনুভূতি নাড়া দিতে পেরেছে? উল্লিখিত দুটি ঘটনাই সমাজের নিষ্ঠুরতার ক্রমবর্ধমান প্রতিচ্ছবি। 'গণহত্যা' শব্দটি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। ওই বীভৎসতার সাক্ষী বাঙালি জাতির চেয়ে বিশ্বে আর ক'টি জাতি আছে? বিশ্বনিন্দিত ওই ঘটনার অর্থাৎ সেই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। সেই দেশেই কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা রোগ-বালাইয়ে নয়, শিল্পের কারিগর বা তাঁতি পাখিখ্যাত বাবুইপাখি নিধনযজ্ঞের পাশাপাশি তাদের বাসাবাড়ি পুড়িয়ে ফেলার নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্তযোগ্য কোনো প্রতিকারের প্রত্যাশা কি করা যায়?
পাখির রূপে মুগ্ধ, এমন মানুষের সংখ্যা অসংখ্য। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় প্রকৃতি থেকে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির পাখি। এই যে এতগুলো বাবুইপাখি হত্যা করা হলো, তাদের শৈল্পিক বাসাগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো, এর মধ্য দিয়ে মানুষ নামধারী অমানুষদের বর্বরতাই প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের সমাজের মানুষ বন্যপ্রাণীর প্রতি কতটা নির্মম-নিষ্ঠুর এরও দৃষ্টান্ত আছে অনেক।
বন্যপ্রাণী রক্ষায়, পাখি রক্ষায় দেশে বিশেষ আইনি বিধান রয়েছে। পাখি হন্তারকদের সাজাও নির্দিষ্ট। কিন্তু মানুষের মতো এমন নিষ্ঠুর প্রাণী তো আর নেই। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণী একসঙ্গে হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ মারতে পারে? দেশে-দেশে মানুষ হত্যার উন্মাদনা সভ্যতার উৎকর্ষও থামাতে পারছে না! সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে, সর্বশেষ মিয়ানমারে মানুষের হাতে মানুষ নিধনযজ্ঞের উন্মাদনা সভ্য দুনিয়ার বুকে কশাঘাত ছাড়া বৈ কি! জীবনের বাঁকে বাঁকে যেন শুধুই দুঃখরেখা। মানুষ তো শুধু মানুষই মারছে না; এই পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে ফেলার মতো বোমাও তৈরি করে রেখেছে। ক্ষয়ের ক্ষেত্র ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে। এমতাবস্থায় পাখি নিধন তো অনেকের কাছেই তুচ্ছতুল্য ঘটনা।
পশুপাখি ও প্রাণিকুল প্রতিবেশ ব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ। শুধু তা-ই নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ওরা অবিকল্প। পাখি জীবন ধারণের জন্য যতটা ধান খায়, এর চেয়ে অনেক বেশি নিধন করে ধান কিংবা কৃষিপণ্য বিনাশী পোকামাকড়। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পোকা নিধন ও পরিবেশবান্ধব বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে জমিতে 'পাখি বসার খুঁটি' বা 'পার্চিং' পদ্ধতির পথ অবলম্বন করে দেশের অনেক অঞ্চলে ব্যাপক সুফল পেয়েছে এবং বর্তমানে এর প্রসারে পরিকল্পনা করছে।
চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুং এক সময় চীনের উন্নয়নে বাধা হিসেবে চড়ূইপাখিকে শত্রু চিহ্নিত করে নিধনের নির্দেশ দেন। কিছুদিন না যেতেই চীনের কৃষি উৎপাদনে এর চরম বিরূপ প্রভাব পড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে চীন চড়ূইপাখি আমদানি করে সেই কৃষি উৎপাদনের বিপর্যয় ঠেকিয়েছিল। যে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের অংশ আমরা ও অদৃশ্য বন্ধনে তাবত দুনিয়ার অর্থাৎ 'ভুবন গ্রাম'-এর সব প্রাণ একসঙ্গে বাঁধা। সেখানে প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ কিংবা জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হলে এর বিরূপ প্রভাব সর্বব্যাপী হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। মুক্তি ও শান্তির প্রতীক বাংলার প্রকৃতির বড় সম্পদ পাখির দেশে মানুষরূপী দানবদের এত সদম্ভ বিচরণ ও শান্তিপ্রিয়দের বসবাস সমাজে কতটা সুখের- এই প্রশ্ন উচ্চারণে সত্যিই সাহস লাগে; অনেক সাহস লাগে। চারদিকে এত ক্ষয়, শুধুই যেন ক্ষয়! নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের অবক্ষয়! মানবতার ওপর এত আঘাত!
বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ-নিরাপত্তা আইনের উভয় ক্ষেত্রে পাখি নিধনের যে প্রতিকার-প্রতিবিধান রয়েছে, এর যদি সুষ্ঠু কিংবা যথাযথ প্রয়োগ হতো, তাহলে নলছিটি কিংবা ইন্দুরকানীতে সংঘটিত নির্মমতা-নিষ্ঠুরতা সংবাদমাধ্যমের খোরাক হয়ে উঠত না। ওই বিধান মানলে 'দয়ালু' ইউএনও অভিযুক্তকে ক্ষমা করে দিতেন না। আমাদের সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচারের পথ মসৃণ করার দাবি দীর্ঘদিনের। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি নিয়েও কথা এ পর্যন্ত কম হয়নি। এই পরিস্থিতি যেখানে বিদ্যমান, সেখানে কয়েকশ বাবুইপাখি হত্যা ও তাদের বাসাবাড়ি ভেঙে ফেলার বিচার প্রত্যাশা দুরাশার নামান্তর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দুই পাখি', কাজী নজরুল ইসলামের 'আমি হব সকাল বেলার পাখি', জীবনানন্দ দাশের 'আবার আসিব ফিরে', পল্লীকবি জসীম উদদ্ীনের 'পল্লী জননী', ফররুখ আহমদের 'পাখির বাসা', আহসান হাবীবের 'পাখি', রজনীকান্ত সেনের 'স্বাধীনতার সুখ', শামসুর রাহমানের 'বাঁচতে দাও', মহাদেব সাহার 'চাই পাখির স্বদেশ' ইত্যাদি পাখিবিষয়ক কবিতায় হীরক খণ্ডের মতো শুধু পাখির দ্যুতিই ছড়ায়নি, সমাজবাস্তবতার আরও কত কিছুরই না সাক্ষ্য মেলে।
পাখি হন্তারকরা মানুষের শান্তিভঙ্গেরও কারক। এ দেশের মানুষের নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে কত ক্ষেত্রেই এখনও বসবাস! পশুপাখি আর মানুষের কতজনই তো বিপন্নতা-বিপর্যস্ততার বৃত্তাবদ্ধ! নি-পাখি সমাজে মানুষ কতটা ভালো থাকবে, প্রতিবেশ-পরিবেশ কতটা সুস্থ থাকবে- এ প্রশ্নগুলোও আঁধারের মুখেই ঠেলে দেয়। আঁধার যেন জীবনে, সমাজে জেঁকে বসেছে। কখনও কি কাটবে না এ আঁধার?
সাংবাদিক ও লেখক
deba_bishnu@yahoo.com
