ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উপাচার্য নিয়োগেও 'লাল ফিতার দৌরাত্ম্য'

বিশ্ববিদ্যালয়

উপাচার্য নিয়োগেও 'লাল ফিতার দৌরাত্ম্য'

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২১ | ১৬:৩৯ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২১ | ১৮:৩৭

বর্তমানে দেশের বেশকিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই। এর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত দিয়ে কাজ চলছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত হিসেবেও কেউ নেই। আগামী জুন মাসের মধ্যে আরও প্রায় ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হবে। চার থেকে পাঁচ মাস ধরে উপাচার্য পদ শূন্য হওয়া সত্ত্বেও নতুন উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণও স্পষ্ট।
উপাচার্য না থাকা মানে বিশ্ববিদ্যালয়টি অভিভাবকহীন হয়ে থাকা। যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় নতুন উপাচার্য নিয়োগকেন্দ্রিক- কে হচ্ছেন পরবর্তী উপাচার্য? কার যোগ্যতা কত! এই যোগ্যতা-অযোগ্যতার পর্যালোচনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুব বেশি মানানসই না হলেও এমন সংস্কৃতিচর্চায় আমরা মেতে উঠি। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় কেউ কেউ পর্দার আড়াল থেকে কাঠি নাড়েন, আবার কেউ প্রকাশ্যেই উপাচার্য পদ বাগিয়ে নিতে উচ্চমহলে জোর তদবির শুরু করেন। এমন সংস্কৃতিতে শুধু শিক্ষকদের সম্মানহানিই হয় না, বরং সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদার প্রশ্নে আঘাত হানে।
১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগ হওয়ার কথা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সমসাময়িককালে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া মূলত সরকারই উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে থাকে। ফলে উপাচার্য হওয়ার জন্য একজন শিক্ষকের প্রধান যোগ্যতা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কিংবা আনুগত্য। বিশেষ করে, এ ক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয়, গত প্রায় ২০ বছর হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন হয়নি। দেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তা অনেকটা প্রচলন হয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে উপাচার্য হতে আগ্রহী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সরকারই মূলত পছন্দমতো শিক্ষককে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়।
উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা অধ্যাদেশ-১৯৭৩-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী, স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের বিধান- সিনেটররা নির্বাচনের মাধ্যমে তিনজন ব্যক্তির প্যানেল করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দেবেন। একজন উপাচার্য নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত সম্মতি দিলে আদেশ জারি হয় মন্ত্রণালয় থেকে। প্রচলিত নিয়মে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার আচার্য তথা রাষ্ট্রপতির। তবে রাষ্ট্রপতি এককভাবে এ নিয়োগ দেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে আসা নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাব আকারে নথি তৈরি করে। এটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বা অন্যান্য পদে কে নিয়োগ পাচ্ছেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওপর। সংগত কারণেই এটা পরিস্কার- শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই নথি তৈরি এবং অবগতকরণ কার্য সম্পাদন করে। ফলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হচ্ছে; সে খবরটি রাখা এবং সংশ্নিষ্ট দপ্তরকে অবহিতকরণের কাজটিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। কাজেই সম্ভাব্য শিক্ষকদের নাম তালিকা সংগ্রহ এবং তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো ও সময়মতো উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
আমরা বাংলাদেশে 'আমলাতান্ত্রিক জটিলতা' কিংবা 'লাল ফিতার দৌরাত্ম্য'র কথা শুনে থাকি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগেও যে 'লাল ফিতার দৌরাত্ম্য' শুরু হয়েছে, তা এখন উপলব্ধি করছি। বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে 'মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা' নামে একটি শাখা রয়েছে। কখন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সে হিসাবটি অনুপুঙ্খ থাকার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট ব্যত্যয় লক্ষ্য করছি। উপাচার্য নিয়োগের বিলম্ব প্রক্রিয়া থেকে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক- উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো অধ্যাপক উপাচার্য নিয়োগ পেতে তদবির শুরু করলেই কি তাহলে মন্ত্রণালয় জানতে পারে, উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হয়েছে! তা না হহলে এই বিলম্বের কারণ কী?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকহীন হয়ে থাকায় অনেক সংকট তৈরি হয়। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রক্রিয়াটি শুরু করা উচিত। এমনকি আগে থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষা কাঠামোর এই গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা যুক্তিসংগত।
সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sultanmahmud.rana@gmail.com

আরও পড়ুন

×