হামিম গ্রাইন অয়েল কোম্পানি নামের কারখানায় টায়ার পুড়িয়ে তৈরি হয় বিটুমিন ও জ্বালানি তেল। এটি স্থাপন করা হয়। রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের সত্যপীর মাজার সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা এই কারখানার টায়ার পোড়া দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হন স্থানীয়রা। কারখানার বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সত্যপীর খালের পানি। যে খালের পানি দিয়ে চাষ হয় প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে। এই কারখানা পরিবেশ দূষণ, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জানা যায়, প্রায় ৬ মাস আগে সত্যপীর মাজার সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে আব্দুল হাকিম নামের এক ব্যক্তি হামিম গ্রাইন অয়েল কোম্পানি নামের কারখানাটি স্থাপন করেন। স্থানীয়দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালিকপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা অন্য কোনো দপ্তরের অনুমোদন দেখাতে পারেনি। কারখানাটিতে টায়ার পোড়ানোর ফলে প্রতিনিয়ত বাতাসে মিশছে কার্বন মনো অক্সাইড, নাইট্রোজেন ও মিথেনসহ ১৬ ধরনের রাসায়নিক ক্ষতিকারক গ্যাস। এসব গ্যাস বায়ু, পানি, মাটিসহ পরিবেশের সব উপাদান দূষিত করছে।
এই ব্যাপারে কারখানাটির ম্যানেজার রতন কুমার সাহা বলেন, ‘২০ বছর ধরে এই লাইনে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। গন্ধটা সাময়িক। চীন থেকে একটা মেশিন আসবে। সেটা চালু করলে আর গন্ধ ছড়াবে না।’
কারখানার হিসাবরক্ষক সুব্রত দে এ সময় পাশ থেকে বলে ওঠেন, ‘দেশের এত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সব বর্জ্য তো বিল-খালেই ছাড়া হয়। আমরা ১৫ দিনে একবার খালে বর্জ্য ফেলি। আমাদের বর্জ্যে পানি দূষিত হয় না। আমাদের কারখানাটি এখনও পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। এখনও উৎপাদনে যায়নি।’
সরেজমিন দেখা যায়, কারখানাটির দক্ষিণে সারি সারি পাহাড় ও সত্যপীর মাজার, পূর্ব পাশে কৃষিজমি ও ঐতিহ্যবাহী সৈয়দা সেলিমা কাদের ডিগ্রি কলেজ এবং পশ্চিমে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘর। দক্ষিণে রয়েছে সত্যপীর খাল, এর পাশেই কাপ্তাই সড়ক ও স্থানীয় এলাকাবাসীর বসতঘর। এসবের মাঝেই কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। কাপ্তাই সড়ক থেকেই নাকে টায়ার পোড়ানোর গন্ধ পাওয়া যায়। কারখানার ভেতরে ও বাইরে বন উজাড় করে আনা জ্বালানি কাঠ একাধিক
স্থানে রাখা হয়েছে। ভেতরে পাহাড় সমান টায়ারের স্তূপ। কাজ করা শ্রমিকদের শরীর টায়ার পোড়ানো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানাটির টায়ার পোড়ার উৎকট গন্ধে রাতে ঘুমানো যায় না। বাতাসে ও খালের পানিতে কালো বর্জ্য ও ধোঁয়া মেশার ফলে পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিবর্ণ হয়ে পড়েছে চার পাশের পাহাড়ের গাছপালা। কলেজের শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক মিজানুরু রশিদ বলেন, “সত্যপীর খালের উপর নির্ভর করে পশ্চিম পোমরা, কাউখালী ও লোহারপুল এলাকার অন্তত ৬০০ বিঘা জমিতে ধান চাষ হয়। খালটির পানি এভাবে দূষিত হতে থাকলে জমি অনাবাদি রাখা ছাড়া কোন উপায় নেই। পরিবেশ বিধ্বংসী এই কারখানা বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।”
জাহাঙ্গীর আলম নামের অন্য এক কৃষক তার দুই পায়ের কিছু ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে বলেন, ‘গরু পার করতে গিয়ে সত্যপীর খালে নেমেছিলাম। কিন্তু পানি এতোই দূষিত যে, আমার দুই পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এখন চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করছি।”
বড়ঘোনা এলাকার বাসিন্দা নূর করিম বলেন, ‘টায়ার যখন পোড়ানো হয়, তখন উৎকট দুর্গন্ধে আশেপাশে থাকা কষ্টকর হয়। আগে দিনে পোড়ানো হতো, এখন রাতেও কাজ চলে। আমাদের এলাকার একমাত্র কলেজটিতেও পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি শতবর্ষী সত্যপীর মাজারে আসা ভক্ত–অনুরাগীরাও উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।’ স্থানীয় বাসিন্দা হাকিম উদ্দিন বলেন, ‘কারখানার মালিক সবাইকে ম্যানেজ করে পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী দুর্ভোগ পোহালেও দেখার যেন কেউ নেই।’
এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতাউল গনি ওসমানী বলেন, ‘আমি নিজেও এটির পাশ দিয়ে চলাচলের সময় গন্ধ পেয়েছি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক যেই-ই হোক পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি করে ব্যবসা করা যাবে না। আমি কারখানাটির ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’