দারুণ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাঙামাটির পর্যটনশিল্প দাঁড়াতে পারছে না। বেসরকারিভাবে বেশ কিছু আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট গড়ে উঠলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এগিয়ে যেতে পারছে না। পর্যটক ও পর্যটন উদ্যোক্তাদের মতে, আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতুটি প্রতিবছর হ্রদের পানি বাড়ার কারণে তিন মাস ডুবে থাকে। বর্ষা মৌসুমে শুভলং ঝরনা জলমগ্ন থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়। ফলে রাঙামাটিতে নৌভ্রমণ ছাড়া পর্যটকদের উপভোগ করার মতো তেমন কিছু থাকে না। এতে পর্যটকরা দ্বিতীয়বার আর আসতে চান না।
জানা যায়, ইতোমধ্যে রাঙামাটি জেলা পরিষদের উদ্যোগে পর্যটনশিল্পের বিকাশে জেলা পরিষদ থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি প্রক্রিয়াধীন।
রাঙামাটি পর্যটনশিল্প মালিক সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ফদাংতাং রান্দাল বলেন, ‘রাঙামাটির পর্যটনশিল্প বিকশিত না হওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদাসীনতা। পর্যটন খাতের বিকাশের জন্য বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রয়োজন। পর্যটনের উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। তাছাড়া কাপ্তাই হ্রদে যত্রতত্র দখল, দূষণ ও অপরিচ্ছনতা দূর করে যোগাযোগে উন্নতি ঘটাতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয় কাপ্তাই হ্রদ। এতে বিশাল জলাধার সৃষ্টির পাশাপাশি হ্রদ আর পাহাড়ের মিলনে গড়ে উঠে অপরূপ রাঙামাটি। সত্তর দশকের শেষের দিকে সরকার রাঙামাটি জেলাকে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করে। ১৯৮৪ সালের দিকে পর্যটন করপোরেশন পর্যটকদের বিনোদনের জন্য দুই পাহাড়ের মাঝখানে তৈরি করে ঝুলন্ত সেতু। এটিকে কেন্দ্র করে সরকারিভাবে গড়ে উঠে পর্যটন মোটেল। তবে দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা ছিল না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যটক আকর্ষণে ঝুলন্ত সেতু তৈরি করা হলেও দীর্ঘদিন সেটির কোনো আধুনিকায়ন হয়নি। এরপর পর্যটনশিল্পের বিকাশে কার্যত আর কোনো সরকারি উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তির পর পাহাড়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এলে রাঙামাটিতে বেসরকারি অনেক পর্যটন স্পট গড়ে ওঠে। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী পর্যটন বিভাগকে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করে সরকার। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জেলা পরিষদ জেলার পর্যটনশিল্পের বিকাশে নানা উদ্যোগ নিতে পারত। তবে উল্লেখ করার মতো উন্নয়ন তারা করতে পারেনি। বেসরকারি পর্যটনগুলোতেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যাংক ঋণের সুবিধা না থাকায় সেগুলোও বিকশিত হতে পারছে না। কাপ্তাই হ্রদ ঘিরে কিছু হাউস বোট ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠলেও পর্যটনশিল্পে সরকারি পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন তেমন নেই। অথচ এখানে হ্রদ, পাহাড়ের মনোরম পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র
গড়ে তোলা সম্ভব। এতে স্থানীয় মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়ত।
রাঙামাটিতে পর্যটনের আকর্ষণীয় স্পটের মধ্যে রয়েছে, পর্যটন করেপারেশনের ঝুলন্ত সেতু, পুলিশের পলওয়েল পার্ক, রাজবন বিহার, জেলা প্রশাসনের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিসৌধ, সাংপাং রেস্টুরেন্ট, আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কে গড়ে উঠা বার্গী লেক, ডিভাইন লেক, নীলাঞ্জনা, বড় গাঙ। এছাড়াও, বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের মনোরম পর্যটন স্পট, কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠা জুম রেস্তোরাঁ, নিঃসর্গ রিভার ভ্যালি, কাপ্তাই জল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফূলী পেপার মিলস্ও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যোন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
রাইন্যাটুগুন ইকো রিসোর্টের মালিক ললিত সি চাকমা বলেন, ‘বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এখানে পর্যটন খাতে ব্যাংক ঋণের জটিলতা রয়েছে। পর্যটনের উদ্যোক্তাদের সরকারের পক্ষ থেকে অনুপ্রেণো ও প্রণোদনা দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তার অভাব কথাটি সঠিক নয়। তবে এখানকার পর্যটন খাতে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলে তার সুফল আসবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও এগিয়ে আসতে হবে।’
সরকারি পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ‘রাঙামাটিতে পর্যটক টানতে ঝুলন্ত সেতুটি আধুনিকায়ন করা দরকার। এ ব্যাপারে পর্যটন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। পর্যটন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশে শিশু পার্কে রাইড বাড়াতে হবে, শিশুদের সময় কাটানোর জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।’
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী এ ব্যাপারে বলেন, ‘রাঙামাটির পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি–বেসরকারি উদ্যোক্তদের এগিয়ে আসতে হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য জেলা পরিষদ থেকে ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।’