এক মৃত্যুতে টনক নড়েনি একই স্থানে আরেক মৃত্যু
সৌঁতি জালের ফাঁদ
সিংড়ার রানীনগর স্লুইসগেট এলাকায় মাছ শিকারের জন্য রানীনগর সমাজ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায় ইজারা নেন স্থানীয় প্রভাবশালী আলমাস, আইয়ুব আলীসহ ১০-১২ জন। সেখানে অবৈধভাবে সৌঁতি জালের ফাঁদ পেতে মাছ শিকার করেন তারা। গত বুধবার মাদ্রাসাছাত্র কাওছার আলী গোসলে গিয়ে স্রোতে ভেসে সেই জালে আটকা পড়ে। এক দিন পর ফাঁদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২০১২ সালে একই স্থানে সৌঁতি জালে আটকে ইজারাদার আলম হোসেনের ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেলিম হোসেন প্রাণ হারান। তাঁর চাচা নুর মোহাম্মাদ জানান, ঘটনার দিন ওমরপুর হাটে যাওয়ার সময় সেলিমকে সৌঁতি জালের মাছ তুলতে বলে আলম। মাছ তুলতে গিয়ে জালে আটকে যায় সেলিম। জালে জড়ানো মরদেহ উদ্ধার করে এলাকাবাসী। তার মৃত্যুর পরও সৌঁতি জাল দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করেনি প্রভাবশালীরা।গুড়নাই নদীর পানাউল্লা খালের ওপর স্লুইসগেট ঘিরে তৈরি হয়েছে এ মৃত্যুফাঁদ। সেখানে মারা যাওয়া মাদ্রাসাছাত্র কাওছারকে বৃহস্পতিবার দাফন করা হয়েছে। প্রথমে তার মৃত্যু নিয়ে পরিবারের অভিযোগ থাকলেও পরে কেউ বাদী হয়নি। ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন হয়েছে।
শুক্রবার স্লুইসগেটে গেলে সাংবাদিক দেখেও না দেখার ভান করে চলে যান কাউছারের চাচা শহিদুল ইসলাম। তিনি ভাতিজার মৃত্যু নিয়ে অভিযোগ তুলেছিলেন। জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে অবৈধ জালে আটকে ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবার ডুবে মৃত্যুর কথা জানালে এবং বাদী না থাকায় লাশ হস্তান্তর করা হয়।
নিহত ছাত্রের বাবা কৃষক হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে জানান, তিনি কাজে যাচ্ছেন। বাড়িতে গেলে মা মুনজিলা বেগম বলেন, ‘ছেলেটি হয়তো স্লুইসগেটের পাকার সঙ্গে বাড়ি লেগে পা হড়কে মারা গেছে। এখন কোনো দাবি নেই।’
৭২ বছর বয়সী দাদা জাম মণ্ডলের ভাষ্য, নাতির মৃত্যুর বিষয়ে কিছু জানেন না। কাউকে দায়ীও করতে চান না তারা। কাওছারের সহপাঠী রিফাত হোসেন বলছিল, প্রতিদিন একসঙ্গে নদীতে গোসল করে তারা। বুধবার তারা মসজিদে গেলেও কাওছার যায়নি। পরে জানতে পারে, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
কাওছারের মাদ্রাসা তেলিগ্রাম বামনহাট বক্তারপুর দাখিল মাদ্রাসায় গেলে এগিয়ে আসে সহপাঠী জুনাইদ আহমেদ শিস এবং রাইয়ান রিয়াদ। তারা জানায়, লেখাপড়া আর নদীতে ছিপ ফেলে মাছ ধরত তারা। সে ভালো বন্ধু ছিল।
মাদ্রাসা কমিটির সাধারণ সদস্য ৭২ বছরের কৃষক আকবর আলী মোল্লা। কাওছারকে ভালো ছেলে হিসেবে জানেন তিনি। তিনি বলেন, যারা সৌঁতি জাল দিয়ে মাছ মারে, তাদের কাছে স্লুইসগেটের চাবি আছে। কৃত্রিম স্রোত তৈরি করতে গেট বন্ধ করে চাপ তৈরি করে। পানি বেড়ে গেলে চাবি দিয়ে গেট খুলে স্রোতে মাছ শিকার করে। মাদ্রাসার সুপার সাহিন আলম বলেন, কাওছার বুধবারও মাদ্রাসায় ক্লাস করে বাড়ি যায়।
এর আগে মারা যাওয়া সেলিমের বাড়িতে গেলে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন ভাই আলমের স্ত্রী কাকলী খাতুন। তিনি বলেন, সেলিম তাঁর বিয়ের আগেই মারা গেছে। শুনেছেন সৌঁতি জালে আটকে তার মৃত্য হয়েছে।
জানা গেছে, সৌঁতি জাল পাতা হয় নদী বা খালের স্রোতের স্থানে। দু’পাশ থেকে বাঁশের বেড়া দিয়ে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত করে মাঝে জালের ফাঁদ পাতা হয়। এতে সব মাছ আটকা পড়ে। তবে এ জালে আটকে নয়, কাওছারের মৃত্যু নদীতে পড়ে হয়েছে বলে দাবি ইজারাদার আলম হোসেনের। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার সময় সৌঁতি জাল ওঠানো ছিল। ভাইয়ের মৃত্যুর বিষয়ে বলেন, নদীতে গোসল করতে মৃত্যু হলে স্রোতে ভেসে জালে আটকে যায় সে।
রানীনগর সমাজের সদস্য আবুল হোসেন বলেন, খালটি আগে থেকেই মসজিদ ও মন্দিরের নামে ইজারা দেওয়া হয়। এ বছর ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
দু’দিন আগেও সৌঁতি জাল অপসারণে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানান জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার স্লুইসগেটে কোনো অবকাঠামো বা অভিযুক্তদের পাওয়া যায়নি। সরকারি তালিকাভুক্ত পুকুর ছাড়া জলাশয়, নদনদী, খালবিল ইজারা দেওয়া অবৈধ।
খাল বা নদী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইজারা দিতে পারে না বলে জানান ইউএনও মাহমুদা খাতুন। তিনি বলেন, অবৈধ সৌঁতি জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে।
