মাদক পরিবহনের হটস্পট বিয়ানীবাজার সীমান্ত
আহমেদ ফয়সল, বিয়ানীবাজার (সিলেট)
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সীমান্তবর্তী কাঁটাতারের বেড়ায় পাহারা বসিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। সিলেটের যে ক’টি অঞ্চলে প্রায়ই সীমান্তে গুলির ঘটনা ঘটে তার মধ্যে অন্যতম এই বিয়ানীবাজার সীমান্ত অঞ্চল। এখানে গুলিতে মাঝেমধ্যে নিরীহ বাংলাদেশিদের রক্ত ঝরে, ঘটে অহরহ হতাহতের ঘটনা।
এত কঠোর নজরদারি যেখানে, সে পথে কী করে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসায়ী প্রবেশ করছে ইয়াবার চালান নিয়ে–এ নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে এপারের বাসিন্দাদের ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
বাস্তবতা হচ্ছে, সিলেটের এ সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ ও বিজিবির পাহারা ও দুর্ভেদ্য সেই কাঁটাতার পেরিয়ে দেদার প্রবেশ করছে নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবা। যেটুকু ধরা পড়ছে তা সীমান্তের এপারে প্রশাসনের তৎপরতায়। অথচ ভারত থেকে কোনো ধরনের বাধা ছাড়া এসব মাদকের চালান ঢুকছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে।
অভিযানে পাচার হয়ে দেশের সীমান্তে আসা এসব মাদকের একাংশ সম্প্রতি আটক হয়েছে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের হাতে। সূত্র জানায়, গত ১৫ দিনে পাঁচটি অভিযানে পুলিশের জালে আটক হয়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা।
পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিয়ানীবাজারের চারখাই পুলিশ ফাঁড়ির সামনে চেকপোস্ট এলাকায় যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেটকার ও অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে এসব ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭ জনকে আটক করা হয়। আটকদের সবার বাড়ি সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলায়।
গত ১৯ আগস্ট বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ সিলেট-জকিগঞ্জ মহাসড়কের চারখাইয়ে যাত্রীবাহী একটি বাসে তল্লাশি চালায়। এ সময় বাসে থাকা জকিগঞ্জের জাহিদ নামে এক ব্যক্তির শরীর তল্লাশি করে তিন হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মাদক পরিবহনের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে।
২৫ আগস্ট চারখাইয়ে একটি মাইক্রোবাস তল্লাশি করে সাড়ে সাত হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ। এ সময় মাইক্রোবাসের যাত্রী-চালকসহ তিনজন আটক হন। একইভাবে ৩০ আগস্ট এক হাজার ৮০০ পিস, ২ সেপ্টেম্বর ছয় হাজার পিস এবং সর্বশেষ ৪ সেপ্টেম্বর সাত হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ। পৃথক এসব অভিযানে আরও তিনজন আটক হন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দাবি, বিশেষ কোনো সুবিধা পাওয়ার কারণে মাদক পরিবহনে এ রাস্তার ব্যবহার বাড়ছে।
বিভিন্ন সূত্র এবং চারখাই বাজারের ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে সারাদেশে ইয়াবা পাচারের শক্তিশালী নেটওয়ার্কগুলোর অন্যতম সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ এলাকা। এখান থেকে পরিচালিত হচ্ছে মাদক পরিবহন, মজুত, কেনাবেচার কার্যক্রম; যার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সিলেট শহরে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক রাজনীতিবিদ ও সচেতন বাসিন্দারা জানান, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলছে মাদক ব্যবসা। পাচারকারীরা সিলেট থেকে এসব ইয়াবা দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে বৈধ পণ্যের আড়ালে পাচার করছে। বিয়ানীবাজারের চারখাই ও শেউলার জিরো পয়েন্ট এলাকা দিয়ে প্রতিদিন নানা কৌশলে চোরাচালান ও মাদক পাচার হলেও বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের অভিযানে আটক হচ্ছে তার খুব কমই।
পুলিশ প্রশাসনে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের পট পরিবর্তন কিংবা সরকার বদল হলেও পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক একই রয়ে গেছে। বিগত সময়ে জেলার এক যুবলীগ নেতা এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতেন। ওই কর্মকর্তার দাবি, সেই নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে জেলা যুবদলের এক প্রভাবশালী নেতার হাতে।
চারখাই এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক মাস আগে এ এলাকা থেকে পুলিশ অবৈধভাবে আসা ভারতীয় প্রসাধন ও জিরা আটক করতো। এখন ইয়াবার মতো মাদক পাচারের রুটে পরিণত হয়েছে এটি।
- বিষয় :
- মাদক