নামমাত্র দামে কোটি টাকার গাছ বিক্রি
ছাতক-দোয়ারাবাজার সড়কের পাশে কেটে ফেলে রাখা সরকারি গাছ। মঙ্গলবার তোলা ছবি সমকাল
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২১ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সড়ক ও নদীতীরবর্তী এলাকার অসংখ্য পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। সড়ক প্রশস্ত করার অজুহাতে কাটা এসব গাছ বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, কোটি টাকা দামের এসব গাছ বিক্রি করা হচ্ছে খুবই কম দরে।
বন বিভাগের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় দেড় কোটি টাকার বিভিন্ন প্রজাতির এসব গাছ দরপত্রের মাধ্যমে নামমাত্র দামে বিক্রি করায় তীব্র আলোড়ন ও সমালোচনা চলছে স্থানীয়দের মাঝে। সম্প্রতি সিলেট অঞ্চল বন বিভাগের দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসংখ্য পুরোনো গাছ নামমাত্র দরে বিক্রি করায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন এলাকাবাসী।
বন বিভাগের এসব গাছ কাটার অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি নামে একটি সামাজিক সংগঠন। ওই অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, সিলেটের বন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে। এতে গাছের দাম, নিলাম প্রক্রিয়া ও কাঠের পরিমাণ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন অংশে রোপণ করা প্রায় দুই যুগের বেশি সময়ের পুরোনো রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণি, জাম, পিটালি, অর্জুন, ছাতিয়ান, জারুল, গামার, কড়ই, চাম্বল, বাবলা, কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতির শত শত গাছ রয়েছে। গাছ ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এসব পুরোনো প্রতিটি গাছের বর্তমান বাজারদর ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে। অথচ দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দর অনুযায়ী ছোট-বড় প্রতিটি গাছের গড় দাম পড়েছে মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার টাকা।
স্থানীয় বন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের হানিমাবাদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত এবং তকীপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে মোট তিনটি লটে ৪৩৪টি গাছ কাটার অনুমতি দেয় সিলেট অঞ্চল বন বিভাগ। এ ছাড়া হানিমাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত আরও একটি লটের ৭০২টি গাছ কাটার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। ইজারাকৃত এসব গাছ কাটার জন্য সাতটি শর্ত বেঁধে দিয়ে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সিলেট বন বিভাগ সর্বশেষ গত ১০ আগস্ট তকীপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত একটি লটে মোট ৪৩৪টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটার অনুমতি দেয়। সেখানে কাঠের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ দশমিক ২৯ ফুট। এর ইজারাদর ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে কাগজে-কলমে নির্ধারিত সীমানা ও শর্ত ভঙ্গ করে গাছ কাটা, পরিবহনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের অনুমোদনপত্রে তকীপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় গাছ কাটার কথা উল্লেখ রয়েছে। সরেজমিন তাজপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত গাছ কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কেটে ফেলা বেশির ভাগ গাছের বাজাদর ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এসব গাছের মোট পাঁচটি লটের মধ্যে চারটির সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয়েছেন সুনামগঞ্জের সুমন আহমদ নামে এক ঠিকাদার। তিনি দ্রুত সময়ে ওই চার লটের গাছ কেটে নিয়েছেন। অন্যদিকে হানিমাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত ৭০২টি গাছের লটের সর্বোচ্চ দরদাতা কে–সে তথ্য নেই স্থানীয় বন বিভাগে।
ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাটা গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য গাছ গুনে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো গাছ কাটা হয়েছে, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান গাছের সংখ্যা ও কাগজপত্রে উল্লিখিত সংখ্যার মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কিনা, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কেটে ফেলা গাছের প্রকৃত সংখ্যা, প্রজাতি, বয়স ও বাজারদর নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সরকারি রাজস্বের ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ করা প্রয়োজন।
গাছ কেটে নেওয়ার একই চিত্র দোয়ারাবাজার উপজেলার কারুউগাঁও থেকে ব্রেতুড়া সড়কেও। সেখানে দুটি লটে মোট ৮৫৫টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে কাঠের পরিমাণ বলা হয়েছে ৭৩৪ দশমিক ৭০ ফুট এবং এর ইজারাদর ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ টাকা। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সড়ক প্রশস্ত করার কাজের জন্য গাছগুলো কাটার প্রয়োজন হয়েছে। অথচ স্থানীয়রা বলছেন, গাছ কাটার অনেক আগে ওই সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ছাতক উপজেলায় কর্মরত বন কর্মকর্তা কেএমজি ফেরদৌস বলেন, কাগজে ভুল লেখা হয়েছে। মার্কিং মূলত গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্ত। গাছ কাটার শর্ত ভঙ্গ করা হলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দোয়ারাবাজার উপজেলায় গাছ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, মূলত ওয়ার্ক অর্ডার পেতে দেরি হওয়ায় রাস্তার কাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ জেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দীন বলেন, তিনি জেলায় যোগ দেওয়ার আগে এসব গাছ কাটার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। গাছের দাম নির্ধারণে অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব গাছ নিলামের আগে নিয়ম অনুযায়ী একটি কমিটি গাছের দর নির্ধারণের পর সর্বোচ্চ দরদাতাকে গাছ কাটার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- গাছ