বাড়ছে ডায়রিয়া, শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা
শয্যা সংকটের কারণে নাটোর সদর হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা সমকাল
নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাটোরে হঠাৎ করে ডায়রিয়া রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে পেটে ব্যথা, বমি ও তীব্র পানিশূন্যতা নিয়ে দুই দিনে শতাধিক রোগী সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি। হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে; বাধ্য হয়ে রোগীদের মেঝেতে এবং অন্যান্য সাধারণ ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বড় বিপর্যয় তৈরি করেছে প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব। ভর্তি হওয়া রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে কেবল ওরাল বা আইভি স্যালাইন ছাড়া বাকি সব ওষুধ, স্যালাইনের ক্যানুলা ও অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে হচ্ছে বাইরের ফার্মেসি থেকে।
ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগী নিয়ে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা গেছে। নাটোর শহরের কানাইখালী এলাকার আয়শা আক্তার জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে পেটে ব্যথা ও বমি ভাব নিয়ে তাঁর ছেলের বউ ও মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করান। ভর্তির পরপর নার্সরা হাসপাতাল থেকে একটি স্যালাইন পুশ করলেও প্রয়োজনীয় অন্য সব ওষুধ বাইরের দোকান থেকে কিনে আনতে হয়েছে।
একই চিত্র সদর উপজেলার ইসলাবাড়ী এলাকার আক্তার হোসেনের পরিবারেও। সকালে স্ত্রী রাবেয়া খাতুন (২২) ও ৪ বছরের শিশু সন্তান রাফিকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। আক্তার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী নার্সরা শুধু একটা স্যালাইন ঝুলিয়ে দিয়েছেন। স্যালাইন দেওয়ার জন্য ক্যানুলা থেকে শুরু করে প্রেসক্রিপশনের সব অ্যান্টিবায়োটিক বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের জন্য এই খরচ চালানো ভীষণ কষ্টকর।’
বড়াইগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা বেলাল হোসেন জানান, তাঁর চাচা সালাম হোসেনকে দুই দিন আগে ভর্তি করা হলেও শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। হাসপাতাল থেকে শুধু স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চিকিৎসকরা মূল চিকিৎসা শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ও মহিলা ওয়ার্ডে ৪৭ জন এবং পুরুষ ওয়ার্ডে ৩৯ জন নতুন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে মোট ৮৬ জন রোগী আইসোলেটেড ও সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী আসতে থাকায় শয্যা সংকটের কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও আশপাশের করিডোরে রোগীদের ঠাঁই দিতে হচ্ছে।
ওয়ার্ডে কর্মরত হাসপাতালের স্টাফ নার্স সারাহ আক্তার ও জেসমিন নাহার জানান, হাসপাতালে এমনিতে জনবল সংকট। তার মধ্যে রোগী অনেক বেশি হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। একজন নার্সকে একই সময়ে অসংখ্য রোগীর দেখাশোনা করতে হচ্ছে। তবে চিকিৎসক যে ওষুধ লিখে দিচ্ছেন, তা যথাসম্ভব দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এ এইচ এম আনিসুজ্জামান পিয়াস বলেন, ‘প্রতিবছর ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ কিছুটা বাড়ে। প্রধানত বাইরের খোলা বা পচা-বাসি খাবার খাওয়া এবং অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন।’ তিনি ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে সবাইকে ফুটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান করা, সুষম ও ভালোভাবে রান্না করা খাবার গ্রহণ এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাহাবুবুর জানান, হাসপাতালে আসা অধিকাংশ রোগী তীব্র পানিশূন্যতা নিয়ে আসছেন। তবে হাসপাতালে আসার পর দ্রুত স্যালাইন ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ায় রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং অনেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
নাটোরের সামগ্রিক ডায়রিয়া পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান জানান, পুরো পরিস্থিতি আপাতত স্বাস্থ্য দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইভি স্যালাইন মজুত থাকলেও অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধের কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
- বিষয় :
- হাসপাতাল