রাস্তায় কাদা, স্কুলে যেতে ভালো লাগে না
মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘স্কুলে আসতে আমাদের ভালো লাগে। রাস্তায় কাদার জন্য আসতে কষ্ট হয়। স্কুলে আসতে ভালো লাগে না।’ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে গত বৃহস্পতিবার কথাগুলো বলছিল শিশু শ্রাবণী আক্তার। সে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পশ্চিম নলুয়াবাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শিশু শ্রাবণীর মতো এলাকার অন্যদেরও রাস্তার কাদাপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে এই ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন গলাচিপার গোলাখালী ইউনিয়নের নলুয়াবাগী এলাকাবাসী।
রাবনাবাদ নদীর কোলঘেঁষে গোলাখালী ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে নলুয়াবাগী এলাকা। এখানে ২০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। রয়েছে নলুয়াবাগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নলুয়াবাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম নলুয়াবাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নলুয়াবাগী বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরবাদুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বলইবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ভাড়া চরবাদুরা বাজার, স্লুইস বাজার, বউবাজারসহ পাঁচটি হাটবাজার, তিনটি মাদ্রাসা, কয়েকটি ব্যাংক, বেশ কয়েকটি এনজিও এবং কমিউনিটি ক্লিনিক।
নলুয়াবাগীতে প্রায় ৩২ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ১০ কিলোমিটার পাকা। বাকি ২২ কিলোমিটার কাঁচা, যা তিন যুগেও পাকা হয়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাফিজের খেয়াঘাট থেকে পাটুয়া বাঁধঘাট পর্যন্ত সাত কিলোটিমটার, ঢালীর বাজার থেকে ধলু মৃধার খেয়াঘাট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার, নলুয়াবাগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ঢালীর বাজার পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার, বলইবুনিয়া বাজার থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার, চরবাদুরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বলইবুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত তিন কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক। এসব গ্রামীণ সড়ক পাকা না হওয়ায় এলাকাবাসীর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীদের স্ট্রেচারে তুলে মাথায় করে তিন-চার কিলোমিটার হেঁটে শহরের হাসপাতালে নিতে হয়।
এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে রাস্তায় ধানের চারা রোপণ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। তারপরও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।
নলুয়াবাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফা বেগম বলে, ‘রাস্তাঘাটে অনেক কাদা। স্কুলে আসতে পারি না। স্কুলে আসতে অনেক কষ্ট হয়। প্রায়ই স্কুলে অনুপস্থিত থাকি।’
কলেজ শিক্ষক মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের ভাষ্য, নলুয়াবাগীর অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট একেবারেই নাজুক। দুটি রাস্তা ব্যতীত সবগুলোই কাঁচা। শিক্ষার্থী, রোগী, বয়স্কদের বর্ষা মৌসুমে কাদাপানির রাস্তা দিয়ে চলাচলে কষ্ট হয়। গুরুতর রোগীদের স্ট্রেচার বা খাটিয়ায় করে হাসপাতালে নিতে হয়। কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য বাজরজাত করতে পারেন না। যেখানে সারাদেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নলুয়াবাগীর মানুষ উন্নয়নবঞ্চিত।
গোলখালীর সদ্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, নলুয়াবাগী একটি বিচ্ছিন্ন এলাকা। গ্রামীণ রাস্তাঘাট কাঁচা থাকার কারণে এখানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থী, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনে বেশি সমস্যা হচ্ছে। তাঁর দাবি, দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান থাকার সময় এই রাস্তা পাকা করতে বহুবার প্রস্তাব দিয়েছেন এলজিইডিতে। কিন্তু এখনও রাস্তাগুলো পাকা হয়নি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়ালিয়ার রহমান জানান, নলুয়াবাগীর প্রধান প্রধান গ্রামীণ সড়ক এখনও কাঁচা রয়েছে। এসব সড়কের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এলজিইডি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, কিন্তু গ্রামীণ সড়ক পাকাকরণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা এলজিইডির নেই। এগুলো স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীরা ডিও লেটার দেওয়ার পর বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, পটুয়াখালী জেলায় ১২ হাজার ৩৩৮ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ১১৪ দশমিক ৪০ কিলোমিটার পাকা। বাকি ৯ হাজার ১৩৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এখনও কাঁচা। বর্ষায় কাদাপানি মাড়িয়ে এসব রাস্তায় চলাচল করতে হয় এলাকাবাসীর।
- বিষয় :
- স্কুলছাত্র