স্বাস্থ্যকর্মী নেই, নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে চলছে কেন্দ্রটি
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুরুষ ওয়ার্ডে উল্টে রাখা হয়েছে শয্যা। ছাদ চুইয়ে পড়া পানিতে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে মেঝে। গত বৃহস্পতিবার তোলা
মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘হাসপাতালে ডাক্তার-নার্স কিছুই নাই। একজন ক্যান্সার আক্রান্ত নিরাপত্তা প্রহরীর ওপর ভরসা করে পুরো এলাকা চলছে। তাঁর শরীর খারাপ থাকলে আমরা কোনো সেবাই পাই না। এভাবে হাসপাতাল চলতে পারে না।’ গত বৃহস্পতিবার ক্ষোভের সুরে কথাগুলো বলছিলেন চিকিৎসা নিতে আসা দুর্বাজ মিয়া। এদিন তাঁকে পাওয়া যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক ১০ শয্যাবিশিষ্ট পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত এই ব্যক্তির কথায় আশপাশের এলাকাবাসীর দুর্ভোগের চিত্রই যেন ধরা পড়ে।
নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে প্রায় চার একর জমির ওপর এই হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়। নাসিরনগরের গুনিয়াউক, পূর্বভাগ, চাপরতলা ইউনিয়ন ও পাশের হবিগঞ্জের লাখাই ও মাধবপুর উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা এ কেন্দ্রটি। এখানে দুটি চিকিৎসকের পদসহ মোট ২৪টি পদের উল্লেখ রয়েছে। তবে সরেজমিন জানা গেছে, ২৩টি পদই এখানে শূন্য। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকের দুটি পদ, সিনিয়র স্টাফ নার্সের চারটি পদ, সহ-সেবকের চারটি পদ। এ ছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) একটি পদ, ফার্মাসিস্টের একটি, অফিস সহায়কের চারটি, ওয়ার্ড বয়ের দুটি, কুক-মশালচির দুটি, নিরাপত্তা প্রহরীর দুটি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দুটি পদে জনবল থাকার কথা। হাসপাতালের নথিতে এখানে পাঁচজনকে কর্মরত দেখানো হয়েছে। বাস্তবে নিরাপত্তা প্রহরী কামাল হোসেন সার্বক্ষণিক থাকেন। অন্য কোনো কর্মীকে এখানে পাওয়া যায় না।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে দেখা যায়, হাসপাতালের সবকটি কক্ষের সামনে তালা ঝুলছে। কেবল ওষুধের কাউন্টারের সামনে কয়েকজন রোগী অপেক্ষায় আছেন। তাদের একে একে ওষুধ বুঝিয়ে দিচ্ছেন কামাল হোসেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, আগে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে দিনে ১৫০-২০০ রোগী আসতেন। এখন তা নেমে এসেছে ৩০-৪০ জনে।
কাগজে-কলমে কামাল হোসেন ‘নিরাপত্তা প্রহরী’। বাস্তবে তিনি এই হাসপাতালের সব ভূমিকায় একাই লড়াই করছেন। জেলার বিজয়নগর উপজেলার কেনা গ্রামের বাসিন্দা কামাল ২০১৪ সালে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগ দেন। মাসে বেতন ১৯ হাজার টাকা। তবে ২০২৪ সালে বোন ম্যারো ক্যান্সার, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে তাঁর। এরপর থেকে প্রতি মাসে তাঁর ওষুধের পেছনে চলে যায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বাকি মাত্র চার হাজার টাকায় তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে দিন পার করতে হয় তাঁকে।
কামাল হোসেন জানালেন, টানা দাঁড়িয়ে কাজ করায় ও অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কারণে রক্তের কোষ দ্রুত কমে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা তাই পূর্ণ বিশ্রামে থেকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। নিজে অসুস্থ হলেও তিনি তুলে নিয়েছেন অন্যকে সুস্থ রাখবার দায়িত্ব। দিনের আলোয় রোগীদের ওষুধ বিলিয়েই কাজ শেষ হয় না তাঁর। রাতে পুরো হাসপাতাল পাহারাও দিতে হয় কামালকে। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি যে চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছি, তিনি বলেছেন বোন ম্যারো ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ৫০ লাখ টাকা। পরিবার নিয়ে যেখানে চলতে পারছি না, সেখানে এত টাকা বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার পরও যতদিন বেঁচে আছি এই হাসপাতালে সেবা দিয়ে যেতে চাই।’
জানা যায়, দীর্ঘদিনের অবহেলায় ২০১৯ সালে চিকিৎসকদের দুটি ও কর্মচারীদের একটি আবাসিক ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। মূল ভবনে ২০টি কক্ষ থাকলেও ১৭টিই অব্যবহৃত। ভবনের ছাদ চুইয়ে অনবরত পানি পড়ছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে জমে আছে ময়লার স্তূপ। উল্টে রাখা হয়েছে শয্যা। সব কক্ষের পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে। এমনকি অস্ত্রোপচার কক্ষের (ওটি) ভেতরে সিলিং ফ্যান নষ্ট হয়ে আছে। সেখানেও ময়লা জমে থাকতে দেখা যায়।
এলাকাবাসী জানায়, এখানে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন লাকি আক্তার। গত ১ জুলাই তিনি মারা যাওয়ার পর কেন্দ্রটিতে স্বাস্থ্যকর্মী আর কেউ নেই। কুক-মশালচি ও ওয়ার্ড বয়দের নিয়োগ থাকলেও উপজেলার ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাদের সংযুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি উপজেলা হাসপাতাল থেকে সপ্তাহে দুদিন একজন চিকিৎসক আসেন। চলতি মাসের শুরুতে একজন ডেন্টিস্ট টেকনোলজিস্টকে অস্থায়ীভাবে এখানে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
গুনিয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জিতু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, কয়েক বছর আগেও এখানে অপারেশনসহ সব চিকিৎসা দেওয়া হতো। এখন একজন মুমূর্ষু নিরাপত্তা প্রহরী ছাড়া কেউ নেই।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অদিতি রায় বলেন, উপজেলার মূল হাসপাতালে জনবল সংকট রয়েছে। তবে গুনিয়াউকে সংযুক্তির মাধ্যমে সেবা সচল রাখার চেষ্টা করছেন। জনবল নিয়োগে প্রতি মাসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও গুনিয়াউক ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কথা তিনি জানেন। সংসদে তিনি শূন্য পদে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলেছেন। নতুন করে নিয়োগ হলে এ সংকট কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
- বিষয় :
- স্বাস্থ্যকর্মী