ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাধ্যমিকে ঝরে গেছে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী

মাধ্যমিকে ঝরে গেছে ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী
×

 আমজাদ হোসেন সজল, বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই ঝরে পড়েছে।

কেউ বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিদ্যালয় ছেড়েছে, আবার কেউ এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কিশোরীদের শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ায় নারী শিক্ষার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিতাস উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এই চিত্র পাওয়া গেছে।
পাঁচ বছরের ব্যবধানে একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ঘাটতি, পরিবারের অসচেতনতা, বাল্যবিবাহ, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, একটি শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সম্ভাবনা এবং নারী শিক্ষার অগ্রগতিও জড়িত। তাই তিতাসে মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া ঠেকাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিতাস উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় এক হাজার ৯৬১ শিক্ষার্থী। পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় এক হাজার ৩৭২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৯৫৬ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৫৮৯ জন বা ৩০ দশমিক ০৩ শতাংশ। আবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক হাজার ৩৭২ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯৫৬ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নিয়েও ৪১৬ জন উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অনুত্তীর্ণের হার ৩০ দশমিক ৩২ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৯৬১ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচ বছর পর এসএসসি পাস করেছে মাত্র ৯৫৬ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ এক হাজার পাঁচ শিক্ষার্থী এসএসসি পাসের তালিকায় নেই, যা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর ৫১ দশমিক ২৪ শতাংশ।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নথিতে বিদ্যালয়ভেদে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার চিত্রেও বড় পার্থক্য দেখা যায়। বিশেষ করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর তুলনায় এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং উত্তীর্ণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। 

ইউনিয়ন কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নিবন্ধিত ছিল ১২৪ জন। ২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৪৩ জন, উত্তীর্ণ হয় ৩৪ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র ২৭ দশমিক ৪২ শতাংশ এসএসসি পাস করেছে।
প্রধান শিক্ষক ইকবাল হোসেনের মতে, বিদ্যালয়টি চর এলাকায় হওয়ায় এখানে মেয়েদের বাল্যবিবাহ ও ছেলেদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। এ ছাড়া নির্বাচনী পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এসব কারণে ঝরে পড়ার হার ৭০ শতাংশ। তবে তিনি মনে করেন, এটি ৩০-৩৫ শতাংশ হলে স্বাভাবিক। তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও বিদ্যালয়ে গমনে ব্যাপক অনীহা প্রকাশ পাচ্ছে। এই প্রজন্মকে বিদ্যালয়মুখী করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মাছিমপুর রামগতি রামনিধি ইনস্টিটিউশনে ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ৩৩২ জন। পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ১৫০ জন, উত্তীর্ণ হয় ১০৮ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এসএসসি পাস করেছে।
প্রধান শিক্ষক মাহফুজুর রহমান চৌধুরীর ভাষ্য, ২০২১ সালে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পরবর্তী দুই বছর অর্থাৎ ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিল করোনা মহামারি কাল। এই সময়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ব্যাপক ছিল। যা নবম শ্রেণিতে এসে ধাক্কা লাগে। তবে ২০২৩ সালের পর থেকে স্কুলগামী শিক্ষার্থীর হার স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবছর গড়ে ১০ শিক্ষার্থী অন্যত্র চলে যাচ্ছে, বাল্যবিবাহ ও ছেলেদের প্রবাস যাওয়ার প্রবণতা অনেক।

দুটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যেই শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার চিত্রটি স্পষ্ট। তালিকার বাকি ১২টি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী, এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ফলে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত ধরে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত উত্তীর্ণ করানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
শিক্ষা গবেষক বাতাকান্দি সরকার সাহেব আলী আবুল হোসেন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক শাহ জামান শুভ জানান, অভিভাবকদের অসচেতনতা ও দরিদ্রতার কারণে ঝরে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থী। বৈশ্বিক অপসংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। নারী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ। এই ব্যবস্থাগুলোর উন্নতি করতে পারলে অবশ্যই ঝরে পড়া রোধ হবে। তিনি বলেন, ‘আমার লেখা বিভিন্ন বইয়ে এই বিষয়গুলো তুলে এনেছি। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবকদের সচেতনতা, তাঁর সন্তান কী করছে– খোঁজখবর নেওয়াটা জরুরি।’
তিতাস উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হাইদুল ইসলাম বলেন, উপজেলার অধিকাংশ বিদ্যালয় প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেক্ষেত্রে আর্থসামাজিক অবস্থা; বিশেষ করে দারিদ্র্য অনেকটা ঝরে পড়ার কারণ হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে কর্মের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক তফাৎ। তাই কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আন্তরিকতা ঝরে পড়ার হার কমাতে পারে।

আরও পড়ুন

×