ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হালদা হবে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’

হালদা হবে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’
×

বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হালদা নদী। গুরুত্বপূর্ণ এ নদীর বৈশ্বিক স্বীকৃতির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি তোলা -সমকাল

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নদীর দুই পাড়ের মানুষ এবং প্রাণ-প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সর্ম্পক গড়ে তুলতে ঐতিহ্যবাহী হালদা নদীকে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ ঘোষণার আয়োজন সম্পন্ন করেছে সরকার। ইউনেস্কোর ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার (ম্যাব) প্রোগ্রাম কমিটির কাছে নথিপত্র (ডোসিয়ার) পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। 

হালদা নদীর ২ হাজার ৭০৯ হেক্টর এলাকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনেস্কোর অনেক কর্মসূচির একটি হলো সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণা করে তা পরিবেশ সংরক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা হয়। 

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সভাপতি করে বাংলাদেশে ম্যাবের ১৮ সদস্যের একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে। 
সেই কমিটি প্রাথমিকভাবে হালদা নদীকে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ ঘোষণা করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আন্তর্জাতিক কমিটির কাছে নথিপত্র পাঠিয়েছে। 

হালদা কেন ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ 
হালদা নদীকে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ ঘোষণার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ কমিটি। সেগুলো হলো, হালদা নদী এশিয়ার একমাত্র জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক কার্প মাছের প্রজনন ক্ষেত্র। এই অনন্য বৈশিষ্ট্য হালদা নদীকে বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন করে তুলেছে। নদীতে বিদ্যমান বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির মাছ, ডলফিন ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

হালদা নদীর তীরে লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এ নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এ স্বীকৃতি স্থানীয় সম্প্রদায়ের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। নদীর ইকোসিস্টেম, কার্বন শোষণ ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ স্বীকৃতির মাধ্যমে ইকোসিস্টেম সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ও পরিবেশ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করবে, যা দেশের পরিবেশ ও মৎস্য বিজ্ঞানের উন্নয়নে সহায়ক হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে।

‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ কী
ইউনেস্কো ম্যাবের একটি বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি হলো ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’। যার মূল লক্ষ্য মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে একটি সুষম ও টেকসই সম্পর্ক স্থাপন করা। এই কর্মসূচির আওতায় গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্যসম্পন্ন এলাকাগুলোকে রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা হয়।

বর্তমানে ১৪৫ দেশে ৭৯৭টি ঐতিহ্যগত এলাকাকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণা করে পরিবেশ সংরক্ষণ করে সমন্বিত উন্নয়ন করা হচ্ছে। গত ৩ থেকে ৬ জুন প্যারাগুয়েতে ৩৮তম ম্যাবের আন্তর্জাতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হালদাকে ইউনেস্কো ম্যাব বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণার লক্ষ্যে মনোনয়ন ডোসিয়ার প্রস্তাব ইউনেস্কো সচিবালয়ে জমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এর আলোকে বাংলাদেশ সরকার হালদা নদীকে জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ স্থান হিসেবে ঘোষণা এবং ইউনেস্কো ম্যান অ্যান্ড বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণার লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর এ উদ্যোগ নেয়। সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে এ বিষয়ক বৈঠক হয়। সেখানে ম্যাব বাংলাদেশ কমিটি হালদাকে ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ স্বীকৃতির অনুমোদন দেয়।

এতে উল্লেখ করা হয়েছে, হালদা নদী গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মাছ প্রজনন ক্ষেত্র, ডলফিনের আবাসস্থল ও জলজ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ। হালদা নদী অববাহিকায় অবস্থিত হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে। বিশাল রিজার্ভের অংশ হিসেবে হাজারীখিলকে কোর এরিয়া, নদীপ্রবাহের বাকি এলাকা ও নদীর উভয় পাশে ৩০০ মিটার প্রশস্ত এলাকাকে বাফার জোন এবং অববাহিকার বাকি অংশকে ট্রানজিশন জোন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মূল হালদা নদীর প্রবাহ এবং এর অববাহিকায় অন্তর্ভুক্ত সম্পূর্ণ এলাকাকে বিবেচনা করা হয়েছে।

কোর, বাফার ও ট্রানজিশন জোনে বিভক্ত 
হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি ছড়া, উপনদী এবং হালদার সঙ্গে সংযুক্ত প্রধান সব খালকে ম্যাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কোর জোনে ২ হাজার ৭০৯ হেক্টর এলাকা রয়েছে। সেখানে ২ হাজার ৫১৪ জন মানুষ বাস করে। বাফার জোনে ১০ হাজার ৫৮৮ হেক্টর এলাকা রয়েছে। তাতে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৫ জন বাস করে। ট্রানজিশন জোনে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬০৬ হেক্টর এলাকায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন স্থায়ীভাবে বাস করে আসছেন। তবে কোর, বাফার ও ট্রানজিশন জোনের মধ্যে নদীর ২০ মিটার প্রশস্ত তীরে উদ্ভিদ বেষ্টনী সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দূষণ উৎস অন্তর্ভুক্ত করে ভূমি ব্যবহার, মানচিত্র হালনাগাদ করা, নির্ভরযোগ্য গবেষণার কথা বলা হয়েছে। 

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, বাংলাদেশে ম্যাব জাতীয় কমিটির বৈঠকে হালদাকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণার অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন ইউনেস্কোর আর্ন্তজাতিক কমিটির অনুমোদনও খুব শিগগির মিলবে, আশা করছি। এর আলোকে আমরা সব কার্যক্রম শেষ করেছি।
পাউবোর রাঙামাটি সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, হালদা নদী ঘিরে পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ ভালো। তবে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের ফলে নদীর উভয় তীরের নদীভাঙন, জোয়ার-ভাটা, বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে মানুষ এবং পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে দ্বন্দ্ব বেড়ে যাবে। মানুষের কল্যাণে স্লুইস গেটসহ উন্নয়নমূলক কাজ করা এক রকম বন্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

×