ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অপ্রতিম নেই, পড়ে আছে তার বই-খাতা

অপ্রতিম নেই, পড়ে আছে তার বই-খাতা
×

অপ্রতিমের বই-খাতা পড়ে আছে টেবিলে। ছবি: সমকাল

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৩৬ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:০৯

বাড়ির দরজার বাইরে ঝোলানো কাঠের নামফলকটি দেখলে বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরেই এখন জমে আছে এক পরিবারের গভীর শোক। নামফলকে মা-বাবার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল অপ্রতিমের ছবি। পাশে লেখা-‘অপ্রতিমদের বাসা। প্রযত্নে-নাহিদ ও শাহরিয়ার’। ১৩ বছরের অপ্রতিমকে ঘিরেই যে ছিল বাবা-মায়ের সাজানো পৃথিবী, সেই নামফলক যেন এখন তারই নীরব সাক্ষী।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ছিলেন ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। তার মৃত্যুতে মমতাজ ভিলার ওই বাসাটি এখন শোকে স্তব্ধ। বাবা-মা, স্বজন ও পরিচিতজনেরা একদিকে সন্তান হারানোর শোক সামলানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে অপ্রতিমকে ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে আছেন।

দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে একটি ফটোফ্রেম। তাতে সাজানো অপ্রতিমের ছোটবেলার ১৫টি ছবি। বিভিন্ন বয়সের অপ্রতিমকে দেখা যায় ছবিগুলোতে-কখনো হাসছে, কখনো প্রাণবন্ত চোখে তাকিয়ে আছে। একসময়কার সেই ছবিগুলো এখন পরিবারের কাছে অমূল্য স্মৃতি।

বাড়ির দরজার বাইরে ঝোলানো কাঠের নামফলক। ছবি-সমকাল

অপ্রতিম যে কক্ষে থাকত, সেখানেও ছড়িয়ে আছে তার উপস্থিতির চিহ্ন। সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর বই-খাতা পড়ে আছে। বিছানাটিও রয়েছে আগের মতো। বইয়ের তাকে সাজানো অপ্রতিমের পছন্দের বইগুলোও আছে। যে বইগুলো নিয়ে তার পড়াশোনা, অবসর আর নিজের ছোট্ট জগৎ তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এখনো নীরবে পড়ে আছে। শুধু বই নিয়ে বসা অপ্রতিম নেই।

একটি কক্ষে বসে থাকতে দেখা যায় অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগমকে। একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোকে তিনি ভেঙে পড়েছেন। স্বজনেরা তাকে ঘিরে আছেন। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ নীরবে পাশে বসে আছেন। অপ্রতিমের বাবা শাহরিয়ার ও পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থাও একই। সন্তানের আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই।

আবেগকণ্ঠে ড. নাহিদা বলেন, “ও-ই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। ওর হাসি, ওর কথা, ওর ছোট ছোট আবদারেই আমাদের ঘরটা ভরে থাকত। আজ সেই ঘরেই ও নেই। ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই। আমরা কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেব, জানি না।”

ছবি-সমকাল

অপ্রতিমকে হারিয়ে শুধু তার পরিবারই নয়, শোকাহত তার স্কুলের বন্ধু ও সহপাঠীরাও। শুক্র ও শনিবার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পর অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় রোববারও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে ছুটির দিনেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকেই অপ্রতিমের মা-বাবাকে সমবেদনা জানাতে তাদের বাসায় ছুটে আসেন।

রোববার অপ্রতিমের স্কুলের বন্ধুদেরও দেখা যায় মমতাজ ভিলার ওই বাসায়। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছে, আবার কেউ বন্ধুর কথা মনে করে চোখের পানি মুছছে। যে বন্ধুর সঙ্গে কিছুদিন আগেও স্কুলে সময় কাটিয়েছে, তার মৃত্যুর খবর এখনো অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য।

অপ্রতিমের এক বন্ধু বলে, “অপ্রতিমের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই খারাপ ছিলাম। যখন ওর মরদেহ উদ্ধারের খবর শুনি, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। অপ্রতিম সব সময় হাসিখুশি ছিল। সবার সঙ্গে মিশত। আমি কিছুতেই মানতে পারছি না, সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।”

অপ্রতিম ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাকে ঘিরেই ছিল পরিবারের ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা। তার পড়াশোনা, পছন্দের বই, স্কুল, বন্ধু আর বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সবকিছু যেন থেমে গেছে অপ্রতিমের সঙ্গে।

শুক্রবার দুপুরের পর বাসা থেকে আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হন। পরে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে বিনোদন পার্ক ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’-সংলগ্ন দক্ষিণ সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
 

আরও পড়ুন

×