ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খাসজমিতে বরফকল, উল্টো মামলা

খাসজমিতে বরফকল, উল্টো মামলা
×

বরিশাল ব্যুরো

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৩

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বুড়াগৌরাঙ্গ নদীতীরের খাসজমিতে একটি বরফকল স্থাপনের অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পায় প্রশাসন। সেটি অপসারণে তিন মাস আগে করা হয় সুপারিশ। প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর সুযোগে দখলদাররা উল্টো আদালতে মামলা করেন। সেখান থেকে উচ্ছেদের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই সুযোগে মাসখানেক আগেই কলের মালিকরা বাণিজ্যিকভাবে বরফ উৎপাদন শুরু করেছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে লঞ্চঘাটের পূর্বপাশে বুড়াগৌড়াঙ্গ নদীর তীরে ২০২৫ সালের শেষ দিকে আসিফ আইচ ফ্যাক্টরি নামে বরফকলটি নির্মিত হয়। এর পাশেই মান্তা সম্প্রদায়ের জন্য নির্মিত কলোনি। নদীতীর থেকে এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কেটে ভরাটের পর সেখানে ইট-বালুর পাকা কাঠামো তৈরি করা হয়।

কাগজপত্রে বরফকলটির মালিকানা ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার বাসিন্দা মো. আবুল কাসেমের নামে। তবে রাঙ্গাবালীর কবির হোসেন ও আলমগীর হোসেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অংশীদার। এলাকাবাসী জানায়, বছরখানেক নির্মাণকাজ চললেও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রশাসন তৎপরতা শুরু করে। এই সুযোগে দখলদাররা আদালতে মামলা করলে বিচারক গত ২ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন। 

এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। চরমোন্তাজ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আবু ইউসুফ মো. সরোয়ার হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত ১৩ মে জেলা প্রতিবেদন জমা দেন। কমিটির সদস্য চরমোন্তাজ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হামিদুল হক বাচ্চুর ভাষ্য, তারা সরেজমিন মাপজোক করে দেখেছেন, বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরে ৭৩০৯ দাগের জমির ওপর বরফকলের স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। ওই দাগের জমি সরকারের খাস খতিয়ানুভক্ত। 

প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহসিন উদ্দিন সমকালকে জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে স্থাপনাটি সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর পটুয়াখালী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিলের সই করা গত ৭ জুনের চিঠিতে বলা হয়, ‘আসিফ আইচ ফ্যাক্টরি বরফকলটির উত্তর সীমানায় আবাসিক এলাকা। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ মোতাবেক নিম্নবর্ণিত স্থানে কোনো প্রকার শিল্পকারখানার প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যাইবে না। উপরোক্ত বিধিমালা অনুসরণে আপনার বরফকলের অনুকূলে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করার আইনগত সুযোগ নেই। বিধিমালার আলোকে আপনাকে আপনার মালিকানাধীন আসিফ আইচ ফ্যাক্টর নামক বরফকলটির সব ধরনের কার্যক্রম (নির্মাণ কার্যক্রমসহ) বন্ধপূর্বক স্থানান্তর করে অবহিত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’

এতে আরও বলা হয়, অন্যথায় ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, (সংশোধিত-২০১০) ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩’, অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনাপূর্বক নির্দেশ অমান্য করার কারণে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই চিঠি দেওয়ার ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এদিকে প্রায় ৬ মাস আগে আসিফ আইচ ফ্যাক্টরিতে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দিয়েছে ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলা ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন। বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়ার জন্য রেকর্ডীয় জমি ও এর অনুকূলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে চরমোন্তাজের খাসজমিতে নির্মিত এই বরফকলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। 

এ বিষয়ে ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (রাঙ্গাবালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মো. কাউছার হোসেনের দাবি, বিদ্যুৎ সংযোগটি ছিল চরফ্যাসনের খেজুরবাড়ী এলাকার বরফকলের। মালিকপক্ষ আবেদন করে সংযোগ স্থানান্তর করে চরমোন্তাজে নিয়েছে। চরমোন্তাজের বরফকলটি যে খাসজমির ওপর করা হয়েছে, সেটি তারা জানতেন না।

বক্তব্যের জন্য বরফকলের মালিক আবুল কাসেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। অন্যতম অংশীদার মো. কবির হোসেন গতকাল রোববার বিকেলে দাবি 
করেন, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে, কিন্তু তিনি মালিকপক্ষের কেউ নন। তাঁর অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের তদন্ত কমিটি মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে বরফকলের জমিটি খাসজমি হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এর বিরুদ্ধে এক মাস আগে আদালতে মামলা হয়। আদালতও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর পটুয়াখালী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল রোববার দুপুরে সমকালকে বলেন, বরফকলটি পরিবেশ আইন উপেক্ষা করে অবৈধভাবে স্থাপিত হয়েছে। সে বিষয়ে মালিকপক্ষ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন। মালিকপক্ষ অপসারণের আশ্বাসও দিয়েছিল। পরে কী হয়েছে, সেটা জানা নেই। প্রতিষ্ঠানটি উচ্ছেদ করা হয়নি, উৎপাদন শুরু করেছে– এমন তথ্যও এই প্রতিবেদকের মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারেন। 

রাঙ্গাবালীর ইউএনও নাজমুল হাসানের ভাষ্য, জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বরফকলের মালিকপক্ষকে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর তারা আদালতে একটি মামলা করে ২ সেপ্টেম্বর স্থগিতাদেশ আনায় পরবর্তী কার্যক্রম থমকে যায়।

আরও পড়ুন

×