সাত কোটি টাকার সেতুতে ফাটল
ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের চরকুড়ুলিয়া গনির ঘাটে নির্মাণাধীন সেতু। ছবি: সমকাল
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৫ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৯
সেতু আছে, কিন্তু তাতে ওঠার জন্য দুই পাশে নেই সংযোগ সড়ক। ফলে নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতুটি ছয় বছরেও মানুষের কোনো কাজে আসেনি। সাড়ে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি এখন যেন সংযোগহীন এক অবকাঠামো। কৃষককে ফসল নিয়ে হাট-বাজারে যেতে হচ্ছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে। এদিকে উদ্বোধনের আগে সেতুর বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল ও ভাঙন।
ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের চরকুড়ুলিয়া গনির ঘাটের এই সেতুর এমন দশায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ধীরগতি চলার পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে সেতুর বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। অথচ এখনও সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়নি। এতে সেতুর দুই পাশের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছয় বছর ধরে অপেক্ষার পর সেতু দাঁড়িয়েছে ঠিকই; তার সঙ্গে দাঁড়ায়নি দুই পাশের যোগাযোগ। সাড়ে ৭ কোটি টাকার এই সেতু এখন উন্নয়নের প্রতীক নয়; বরং অপূর্ণ কাজের এক দৃশ্যমান স্মারক। তাদের অপেক্ষা–কবে রাস্তা হবে, কবে সেতু খুলবে, কবে পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে না গিয়ে সরাসরি বাজারে পৌঁছানো যাবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, চরকুড়ুলিয়া এলাকার কয়েকটি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে গনির ঘাট এলাকায় পদ্মার শাখা নদীর ওপর ২০২১ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার ৭৪৯ টাকা। কাজ পায় যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেড। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি তিন দফায় সময় বাড়িয়ে নেয়। সময় বাড়ার সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেতু নির্মাণে ব্যয় দাঁড়ায় ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৩৩ টাকা।
দীর্ঘ সময় ধরে ধীরগতিতে কাজ চলার পর সম্প্রতি সেতুর মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সেতু শেষ হলেও দুই পাশে তৈরি হয়নি প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক। ফলে সেতুর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই।
সেতুটি চালু না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উৎপাদিত ফসল হাট-বাজারে নিতে তাদের বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ দুটোই বাড়ছে।
স্থানীয় এক কৃষক বলেন, সেতুটি চালু হবে– এই আশায় তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন। সেতু নির্মাণের পরও রাস্তা না থাকায় আগের দুর্ভোগই রয়ে গেছে।
এদিকে সেতুটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। এরই মধ্যে বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে শুরু থেকে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। সেতুর বর্তমান অবস্থা দেখে তাদের কারও কারও মনে হচ্ছে, এটি যেন বহু বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ কোনো স্থাপনা।
স্থানীয়দের দাবি, সেতুর নির্মাণকাজে অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কিনা, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের মান যাচাই করে দায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত মানসম্মত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে কথা বলতে যশোরের আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ফুল মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সাড়া মেলেনি। এলজিইডি পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, সেতুটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন। দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- পাবনা