অপ্রতিম হত্যা
ক্লাসে আর কোনোদিন ডাকা হবে না রোল নম্বর ২৯
এশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম
কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৩৭ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৭
কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ‘ক’ শাখার শিক্ষার্থী ছিল নিহত এশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় তার নাম লেখা রয়েছে ‘এশায়াত শাহরিয়ার’ নামে। তার শ্রেণি রোল নম্বর ২৯। আইডি নম্বর ২৫৬০০৭। শিক্ষকরা বলছেন, আর কোনোদিন এ রোল নম্বরটি ডাকা হবে না। সবার প্রিয় অপ্রতিম নেই, সে আর ফিরবে না—এমনটা ভেবে বিষণ্ন তার শিক্ষক ও সহপাঠীরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, হাজিরা খাতার তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১, ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর মোট তিনদিন অনুপস্থিত ছিল অপ্রতিম। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সে বিদ্যালয়ে এসেছিল। এরপর শুক্রবার নিখোঁজ হওয়ার পর আর স্কুলে ফেরা হয়নি তার। গতকাল রোববার বিদ্যালয় খোলার দিনে যথারীতি হাজিরা নেওয়া হলেও হাজিরা খাতায় তার নামের পাশে পড়েছে অনুপস্থিতির চিহ্ন। সহপাঠীদের ভিড়েও নেই পরিচিত মুখটি।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কোটবাড়ি গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অপ্রতিমের সহপাঠী সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার বিকেলে ফেসবুকে যখন দেখলাম আমাদের বন্ধু নিখোঁজ, তখন আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। সে হারিয়ে যাওয়ার মতো ছেলে না, নিশ্চয়ই ওকে কেউ কিছু করেছে।’
অপ্রতিমের সঙ্গে কাটানো শেষ সময়ের কথা মনে করে আরিফ বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলেছি। তখন তো বুঝতেই পারিনি, এটাই ওর সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। স্কুলে কোনো অনুষ্ঠান হলে আমরা এক সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, হাসাহাসি করতাম। সে আজ আর আমাদের মাঝে নেই, এই বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’
মো. সিয়াম নামে অপর এক সহপাঠী বলেন, অপ্রতিমকে শেষবারের মত বিদায় দিতে এসে বুক কেঁপে উঠছে। এত তাড়াতাড়ি তাকে বিদায় দেব এটা ভাবতেও পারিনি। ক্লাসে তার শূন্যতা কোনোদিনও পূরণ হবে না।
স্কুলের শ্রেণিশিক্ষক মহিবুল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবারই সর্বশেষ বিদ্যালয়ে এসেছিল অপ্রতিম। শুক্রবার নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন শিক্ষক ও সহপাঠীরা। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। আজ জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে, এমন বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না তার শিক্ষক ও সহপাঠীরা।
মরদেহের সুরতহালকারী পুলিশের এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া তার শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এর আগে শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিমের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী লালমাই সানান্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম কুবির সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে।
গতকাল রোববার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিমের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসানকে (১৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা রোববার রাতে কুমিল্লার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ছাড়াও সন্দেহভাজন হিসেবে সিয়াম নামে একজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
- বিষয় :
- কুমিল্লা
- অপ্রতিম
- কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়