ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

জীবাশ্ম জ্বালানি তেল নিয়ে চাপের মুখে বিশ্ব নেতারা

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন

জীবাশ্ম জ্বালানি তেল নিয়ে চাপের মুখে বিশ্ব নেতারা

.

আবু সালেহ রনি, দুবাই থেকে

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১১:০৮ | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৫:২৭

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ব্যাপকভাবে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দুর্যোগে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতি বছরই একাধিকবার ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিকম্প মোকাবিলা করছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এর জন্য উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণই প্রধানত দায়ী।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে সহায়তার প্রাপ্তির অভাব রয়েছে। তাই এ লক্ষ্যে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য পৃথক লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড গঠন করে পর্যাপ্ত সহায়তা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।

গতকাল বুধবার দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২৮) সপ্তম দিনের সভায় এ দাবি জোরলো হয়। এদিন জীবাশ্ম জ্বালানি তথা কার্বন নির্গমনকারী জ্বালানি তেল বন্ধের ব্যাপারে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েন বিশ্ব নেতারা। উন্নত বিশ্বের কাছে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে সম্মেলনের সাইড লাইনে পৃথক সমাবেশ ও আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামাজিক ও আর্থিক প্রভাব যা একেবারেই এড়ানো যায় না, সেটাই মূলত ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ বা লস অ্যান্ড ড্যামেজ। কপ২৮ এর প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল জাবের এদিন সম্মেলনে জানান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সম্মেলনের প্রথম পাঁচ দিনে ৮৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জমা হয়েছে। জলবায়ু কর্মে এটি একটি নতুন যুগের গতি স্থাপন করেছে। একই সময়ে ১১টি বিষয়ে অঙ্গীকার বা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা এবারের সম্মেলনকে স্বার্থক করবে। তিনি বলেন, তহবিল বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত ২৫০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে চায়।

সম্মেলনে মূল আলোচনায় জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিয়েল আলোচকদের আগামী সপ্তাহের মধ্যে একটি উচ্চাভিলাষী চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। যাতে বিশ্ব গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের লক্ষ্যগুলো পূরণ করে। তিনি বলেন, ‘এখন মূল বিষয় হলো তুষ থেকে গম বাছাই করা। আমরা যদি এখন জীবন বাঁচাতে চাই এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রাকে ১.৫ লক্ষ্য নাগালের মধ্যে রাখতে চাই। এক্ষেত্রে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। গ্লোবাল স্টক টেক অর্জনের লক্ষ্য পূরণে একযোগে কাজ করতে হবে।’

বুধবার আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে রেকর্ড কার্বন নির্গমনের নতুন রিপোর্ট দিয়ে সতর্ক করেন। শুধু তাই নয়, ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ২০২৩ সালে কার্বন নির্গমন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। কার্বন নির্গমন পরিস্থিতি উন্নতির পরিবর্তে গত দুই বছরে আরও অবনতি হয়েছে। এই নির্গমনের পরিমাণ এ বছর ৪০.৯ গিগাটনে গিয়ে পৌঁছাবে।

বিশ্বের ১২০ জন বিজ্ঞানীর এই নতুন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন দূষণের ফলে পৃথিবী পাঁচটি বিপর্যয়কর জলবায়ু টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। যদি পৃথিবীর গড় উষ্ণতা এক দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উত্তপ্ত হয় তবে ২০৩০ সালে আরও তিনটি দৃশ্যমান হবে।

নতুন রিপোর্ট প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের গ্লোবাল সিস্টেম ইনস্টিটিউটের টিম লেন্টন বলেছেন, ‌‘পৃথিবী সিস্টেমের টিপিং পয়েন্টগুলো এমন একটি বিশালতার হুমকি সৃষ্টি করেছে। যার মুখোমুখি বিশ্ব মানবতা অতীতে হয়নি।’

এদিন ক্লাব অব রোমের ৭৫ জন বিজ্ঞানী কপ নেতৃবৃন্ধের উদ্দেশ্যে এক খোলা চিঠি দিয়েছেন। তারাও কপ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বিরোধিতা করে এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

খোলা চিঠিতে তারা বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ এবং বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। একটির সঙ্গে অন্যটি জড়িত। এ ব্যাপারে বিজ্ঞান নিয়ে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের কোনো বিকল্প নেই। ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্য কার্বন নির্গমন নিশ্চিত করলেই হবে না, ওই সময় পর্যন্ত বিশ্বে যে কার্বন ডাই অক্সাইড বিদ্যমান থাকবে তা শোষণ করার জন্য নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।  

জীবাশ্ম জ্বালানির বিষয়ে এসব রিপোর্ট পরিবেশবাদীদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তারা দিনভর জলবায়ু সম্মলন কেন্দ্রের ভেতরে নানা স্লোগানে তাদের প্রতিবাদ জানিয়ে জলবাযু সম্মেলনের নীতি নির্ধারকদের সতর্ক করে দিয়েছেন। তারা চাইছেন, এবারের জলবায়ু সম্মেলনেই জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের ব্যাপাারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক।

বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরাও জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কপ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের এক পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ‘জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা সম্মেলন কেন্দ্রে একাধিক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ধনী দেশগুলোর ব্যবসায়ীক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা তথা কার্বন নির্গমন হ্রাসের কোনো উন্নতি হব না।’

মঙ্গলবার জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) দ্বারা প্রকাশিত দ্বিতীয় খসড়াটি জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন থেকে চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে। এটি দেখায় যে আলোচকরা জীবাশ্ম জ্বালানির একটি ‘সুশৃঙ্খল এবং ন্যায্য’ পর্যায় আউট করার আহ্বান বিবেচনা করছেন। আলোচনাটি ‘গ্লোবাল স্টকটেক প্রক্রিয়া’র অংশ, যেখানে প্রায় ২০০টি দেশ ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা রোধ করার পরিকল্পনায় একমত হওয়ার চেষ্টা করছে।

পরিবেশবাদীরা দাবি করেন, এবারের জলবায়ু সম্মেলনে দুই হাজার ৪৫৬ জন তেল গ্যাসের পক্ষের লবিষ্টদের অংশ গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যা বিগত মিশর জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেয়া লবিষ্টদের ৪ গুণ। ফলে লবিষ্টদের এই ব্যাপক উপস্থিতি জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

সম্মেলনে বিকেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বরাদ্দের দাবি

লস এ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মালদ্বীপের জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও জ্বালানি মন্ত্রী তরিক ইব্রাহিম। সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট চেইঞ্জ জার্নালিস্ট'স ফোরামের সঙ্গে সম্মেলনে ব্লুজোনের ৩৩ নম্বর কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ দাবি করেন। সংগঠনের সভাপতি আশিস গুপ্তার সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব আসাদুজ্জামান সম্রাটের সঞ্চালনায় এই মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, সহসভাপতি রাবনেওয়াজ চৌধুরী ও শ্রীরাম সুবেদী।

মালদ্বীপের মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক দ্বীপ বসবাসের উপযোগিতা হারিয়েছে। স্যানিটেশনসহ নানা সমস্যার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু দ্বীপগুলো আলাদা আলাদা হওয়ায় এই সমস্যাগুলো আমরা সমাধান করতে পারছি না।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামুদ্রিক কোরাল যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঠিক তেমনি সামুদ্রিক মৎস্য আহরণও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যটন শিল্প থেকে আমাদের ৩০ শতাংশ জিডিপ এলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিযোজনে আরও অর্থ বরাদ্দ দাবি

স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অভিযোজনে জোরালো ভূমিকা রাখতে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে জলবায়ু বিষয়ে গ্লোবাল সাউথে কর্মরত সংস্থাগুলো। গত মঙ্গলবার কপ২৮ সম্মেলনের সাইড ইভেন্টে ব্র্যাক আয়োজিত এক আলোচনায় এ দাবি উঠে আসে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরাও এতে উপস্থিত ছিলেন। 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে আমাদের মানুষরা জলবায়ু-সংকট অভিযোজনের চর্চা করে এসেছে। সহনশীলতার সীমায় পৌঁছার আগেই আমাদের এই চর্চার সুবিধা গ্রহণ করতে হবে।’ 

ব্র্যাকের হেড অব পলিসি ইনিশিয়েটিভস ইসাবেল হুইসনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার পরিচালক সঞ্জয় বশিস্ট, ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড সেক্রেটারিয়েটের প্রধান ড. গোলাম রব্বানী, এফসিডিওর অ্যাডাপ্টেশন অ্যান্ড রিজিলিয়েন্স হেড পিটার বেন্টলি, জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি রেনে ব্যাপ্টিস্ট, আইসিসিসিএডির এমডি সাকিব হক, ঘানা উন্নয়ন কেন্দ্রের সমন্বয়ক সুবির কুমার সাহা এবং একুমেনের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পার্টনারশিপ ম্যানেজার জয়া শাবির সিদ্দিকী প্রমুখ। 

আরও পড়ুন

×