গ্র্যাজুয়েশনের পর দেশের বাইরে মাস্টার্স
রিফাত খন্দকার , সুইডেন থেকে
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২৮
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সুইডেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয়। তবে বিদেশে মাস্টার্স করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু পছন্দের দেশ নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়– শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিষয়, টিউশন ফি, বৃত্তির সুযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয়, গবেষণার সুযোগ এবং পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হয়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা শুরু করার আগে প্রথমেই ঠিক করতে হবে কোন বিষয়ে এবং কোন দেশে পড়তে চান। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্সের মেয়াদ, ভর্তির যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা, টিউশন ফি এবং বৃত্তির সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ভর্তি-শর্ত ও আবেদন করার সময়সীমা যাচাই করা জরুরি। বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্ক হতে হবে। শুধু বিদেশে চাকরির চাহিদা আছে বলে কোনো বিষয়ে ভর্তি হওয়া উচিত নয়। নিজের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, আগ্রহ, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে বিষয়টির সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি দেশে ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের চাহিদা, পেশাগত উন্নতির সুযোগ এবং পড়াশোনা শেষে সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের সময় শুধু র্যাঙ্কিং দেখলে হবে না। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার মান, গবেষণার সুযোগ, শিক্ষক ও গবেষকদের কাজ, ল্যাবরেটরি বা গবেষণা সুবিধা, কোর্সের কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা দেখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শহরটির বাসাভাড়া, খাবার, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় হিসাব করে মোট বার্ষিক খরচের একটি বাস্তবসম্মত ধারণা নিতে হবে।
ভর্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
বিদেশে মাস্টার্সে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়, দেশ ও প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া ডকুমেন্ট চেকলিস্ট ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি। সাধারণত স্নাতক ডিগ্রির সার্টিফিকেট, সব সেমিস্টার বা বছরের একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, বৈধ পাসপোর্টের কপি এবং ইংরেজি ভাষা দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে IELTS, TOEFL বা সমমানের পরীক্ষার স্কোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট শর্তে ইংরেজি-মাধ্যমে পড়াশোনার প্রমাণ গ্রহণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। এ ছাড়া একটি হালনাগাদ Curriculum Vitae বা CV, Statement of Purpose বা Motivation Letter এবং শিক্ষক, গবেষণা-সুপারভাইজার বা পেশাগতভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির Recommendation Letter অনেক প্রোগ্রামে প্রয়োজন হয়। এসব নথিতে শিক্ষার্থীর একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা বা কাজের অভিজ্ঞতা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাভিত্তিক কিছু মাস্টার্স প্রোগ্রামে Research Proposal, Writing Sample, Portfolio বা পূর্ববর্তী গবেষণার তথ্যও চাওয়া হতে পারে। ভর্তি পাওয়ার পর বা ভিসা আবেদনের সময় আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণও প্রয়োজন হতে পারে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্কলারশিপের চিঠি, স্পন্সরশিপের নথি বা অন্যান্য আর্থিক কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী জমা দিতে হতে পারে। তাই ভর্তির কাগজপত্রের পাশাপাশি ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় নথির তালিকাও আগেভাগে প্রস্তুত রাখা ভালো।
সব কাগজপত্রে নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের বানান ও বিবরণে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। প্রয়োজন হলে সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্টের ইংরেজি অনুবাদ, সত্যায়ন বা নির্দিষ্ট ফরম্যাটে জমা দেওয়ার শর্ত থাকতে পারে। তাই শেষ মুহূর্তের ঝামেলা এড়াতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকেই সংগ্রহ, স্ক্যান ও সংরক্ষণ করা উচিত।
আবেদনের সময়সীমা ও প্রস্তুতি
আবেদনের সময়সীমার ক্ষেত্রেও আগে থেকে পরিকল্পনা করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত Fall বা Autumn intake সবচেয়ে বড় এবং বেশি সংখ্যক প্রোগ্রাম এ সময়ে শুরু হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরবর্তী বছরের Fall intake-এর আবেদন আগের বছরের শেষভাগ থেকে শুরু হয়ে শীতকাল পর্যন্ত চলতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে সময়সীমা আলাদা। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও আবেদনকাল দেশ ও প্রোগ্রাম অনুযায়ী ভিন্ন হয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট মাসকে সবার জন্য অভিন্ন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবেদন প্রস্তুতির জন্য অন্তত ১০ থেকে ১২ মাস আগে কাজ শুরু করা সুবিধাজনক। এ সময়ে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা উন্নয়ন, প্রয়োজন হলে IELTS বা TOEFL প্রস্তুতি, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট সংগ্রহ, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, Statement of Purpose বা Motivation Letter প্রস্তুত, সুপারিশপত্রের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
সবশেষে বিদেশে মাস্টার্সের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু একটি দেশের জনপ্রিয়তা বা অন্যের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি তথ্য, বৃত্তির শর্ত, মোট খরচ এবং পড়াশোনা শেষে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও সুযোগ সম্পর্কে তথ্য যাচাই করা উচিত। আগেভাগে পরিকল্পনা, সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং নিজের একাডেমিক ও ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনই বিদেশে সফলভাবে মাস্টার্স করার প্রস্তুতিকে অনেক বেশি কার্যকর করে তুলতে পারে।
- বিষয় :
- উচ্চশিক্ষা