ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্পের বোঝা গ্রাহকের কাঁধে

ঢাকা ওয়াসা

‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্পের বোঝা গ্রাহকের কাঁধে
×

.

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০১:১৮ | আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১০:২৩

কাগজপত্রে ঢাকা ওয়াসা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও সেবার মান নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। অন্য বড় শহরগুলোর তুলনায় রাজধানীতে পানির দাম অনেক বেশি। তবে আবারও দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসা শ্বেতহস্তীর মতো কিছু প্রকল্প নিয়েছে। সেগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার জন্য পানির দাম বাড়ানো হয়। কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতাসহ ব্যর্থতার দায় কেন সাধারণ মানুষ নেবে?

দেশে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) আছে চারটি। এগুলোর পানি উৎপাদন খরচ প্রায় একই রকম। ঢাকা ওয়াসা বিদেশি ঋণে কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়েছে। এগুলো থেকে যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে গেছে। এই কিস্তির টাকা যুক্ত করে পানির উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করা হয়। এ কারণেই দাম বাড়ছে।

চারটি ওয়াসার পানির উৎপাদন খরচের হিসাব নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি উৎপাদন খরচে তেমন পার্থক্য না থাকলেও কাগজপত্রে থাকে অনেক ফারাক। ঢাকা ওয়াসার প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানির উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা। আবাসিক গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে ১৫ টাকা ৯৮ পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহককে গুনতে হয় ৪২ টাকা। খুলনা ওয়াসার উৎপাদন খরচ ১৬ টাকা ৫০ পয়সা। 
 আবাসিকে বিক্রি করে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা। বাণিজ্যিক মূল্য ১৪ টাকা। রাজশাহী ওয়াসার উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ৯০ পয়সা। আবাসিকে ৬ টাকা ৮১ পয়সা, বাণিজ্যিকে ১৩ টাকা ৬২ পয়সায় বিক্রি করে। রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন খরচের ব্যবধান প্রতি ইউনিটে ১৬ টাকার বেশি। বিক্রির ব্যবধান আবাসিকে ১০ টাকা ও বাণিজ্যিকে ২৮ টাকার বেশি। চট্টগ্রাম ওয়াসার উৎপাদন খরচ ১৯ টাকা। তাদের ৯০ শতাংশ পানিই ভূউপরিস্থ উৎসের এবং তা শোধন করা হয়। তারা আবাসিকে বিক্রি করছে ১৮ টাকা। তবে বাণিজ্যিকে ঢাকা ওয়াসার চেয়ে ৫ টাকা কমে ৩৭ টাকায় বিক্রি করছে। 

ঢাকা ওয়াসার উৎপাদিত পানির ৭৫ শতাংশ গভীর নলকূপের। বাকি ২৫ শতাংশ পাওয়া যায় ভূউপরিস্থ উৎস থেকে শোধনের মাধ্যমে। শোধন করা পানির উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি। সে বিবেচনায় ঢাকার পানির দাম চট্টগ্রামের তুলনায় বেশি। খুলনায় ৬০ শতাংশ পানি শোধন করা হয়। রাজশাহীতে ৯০ শতাংশ পানি আসে গভীর নলকূপ থেকে। খুলনা ওয়াসার পানির দামও ঢাকার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া মানের বিবেচনায় ঢাকা ওয়াসার পানি সবচেয়ে নিম্ন বলে অভিযোগ আছে। সরবরাহ ব্যবস্থায়ও আছে ত্রুটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদেশি ঋণে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে গেছে। কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে যে অর্থ প্রয়োজন, তা পানির দাম বাড়িয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয় করতে হচ্ছে। 

একের পর এক ব্যর্থ প্রকল্প

সাভারের তেঁতুলঝোড়া ভাকুর্তা ওয়েলফিল্ড প্রকল্প থেকে প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার পানি পাওয়ার কথা ছিল। হিমালয়ের চ্যানেল দিয়ে ভাকুর্তায় প্রচুর পানি আসে– এ ধারণায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছ থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছিল ওয়াসা। কিন্তু সেখান থেকে পানি পাওয়া যায় লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম। এ ছাড়া প্রায় চার হাজার কোটি টাকা চীনা ঋণ নিয়ে একই সময়ে বাস্তবায়ন করা হয় পদ্মা-যশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্প। এ প্রকল্প থেকে বর্তমানে পানি পাওয়া যায় দৈনিক ৪৫ কোটি লিটারের পরিবর্তে ২০ কোটি লিটার। 

এদিকে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দাশেরকান্দিতে বাস্তবায়ন করা হয় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। তবে পয়ঃবর্জ্য যাওয়ার কোনো নেটওয়ার্ক তৈরি না করায় এই প্রকল্প থেকেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না; বরং এটির ব্যবস্থাপনা বাবদ বছরে ২০০ কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে ঢাকা ওয়াসাকে। এটিও উচ্চ সুদে চীন থেকে নেওয়া ঋণে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ তিনটি ঋণেরই কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। 
গত বছরের অডিট রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, দাশেরকান্দি প্রকল্পে প্রতিবছর ওয়াসাকে ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে ৪৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। পদ্মা-যশলদিয়া প্রকল্পে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে ৫৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ভাকুর্তা প্রকল্পে পরিশোধ করতে হচ্ছে ছয় কোটি টাকা। 

ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ভর্তুকি দিয়ে আর নগরবাসীকে পানি সরবরাহ করা হবে না। বিশেষ করে অতিসচ্ছল ও বিত্তশালীদের পানির দাম বাড়ানো হবে। এ নিয়ে ওয়াসা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু বিত্তশালীদের কীভাবে চিহ্নিত করা যায়, তার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। 

এদিকে অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, ওয়াসা পানি বিক্রি করে যে অর্থ পাচ্ছে, তা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চলার পরও লাভ থাকে। গত অর্থবছরের হিসাবে দেখা গেছে, পানি বিক্রি করে আয় করেছে ১ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। পয়ঃনিষ্কাশন বাবদ আয় ৪৭৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যক্তিগত টিউবওয়েল থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। বোতলজাত পানি বিক্রি, পানির সংযোগ ফি, পানি পরীক্ষা ফি, পানির এটিএম বুথ, গভীর নলকূপের অনুমতি ফি, নবায়ন ফিসহ বিভিন্ন খাত থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছে ওয়াসা। মোট আয় হয়েছে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। বিভিন্ন ধরনের কর পরিশোধের পরও লাভ ছিল ৫২৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ হিসাব থেকেও স্পষ্ট হয়, পানির উচ্চমূল্যের কারণেই ঢাকা ওয়াসা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। 

কে কী বলেন

খুলনা ও রাজশাহী ওয়াসার চেয়ে পানির দাম এত বেশি হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সাক্ষাৎ চেয়েও অনুমতি মেলেনি। তবে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন, অর্থ, পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা) মো. আক্তারুজ্জামান সমকালকে বলেন, দাম বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিভিন্ন কারণ আছে। কিন্তু কী কারণে এটা হচ্ছে– তা বলা যাবে না। প্রয়োজনে জনতথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। 

এ প্রসঙ্গে সংস্থার প্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মোস্তফা তারেকও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘রাজশাহী আর ঢাকা শহরের ভৌগোলিক অবস্থান এক নয়। দুটি শহরের পানির স্তরও এক রকম নয়। পানির উৎসও একই প্রকৃতির নয়। পরিশোধন ব্যয়সহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন খরচে রকমফের হতে পারে। পানির দাম কমবেশি হওয়ার বিষয়টিও আপেক্ষিক। আপনি হয়তো মনে করছেন দাম বেশি। আমরা মনে করছি কম।’ 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, ঢাকা ওয়াসার নেওয়া শ্বেতহস্তীর মতো প্রকল্পগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। সেগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার জন্য পানির দাম বাড়ানো হচ্ছে। এটি একেবারেই উচিত নয়। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাবেক রিসার্চ ফেলো শাহ নূর বলেন, টিআইবির সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত থাকার সময় ঢাকা ওয়াসা নিয়ে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। ওই টিমের তিনি দলনেতা ছিলেন। সে সময় কাজ করতে গিয়ে ওয়াসায় দুর্নীতি, প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতাসহ সংস্থার কার্যক্রমে নানা ধরনের অসংগতি ও ব্যর্থতার তথ্য পাওয়া যায়। এতদিনেও ওয়াসা এসব থেকে বের হতে পেরেছে বলে মনে হয় না। 

আরও পড়ুন

×