ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

জন্মদিন

রুদ্রের কবিতা উত্তর প্রজন্মে

রুদ্রের কবিতা উত্তর প্রজন্মে

--

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০

সত্তর দশকের বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। স্বতন্ত্র কাব্যভাষায় উজ্জ্বল এই কবি নিজস্ব শিল্পকুশলতায় আপন কাব্যবলয় তৈরি করেন। উপদ্রুত উপকূল [১৯৭৯], ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম [১৯৮১], মানুষের মানচিত্র [১৯৮৪], ছোবল [১৯৮৬], দিয়েছিল সকল আকাশ [১৯৮৮], মৌলিক মুখোশ [১৯৯০] তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ।
উত্তর প্রজন্মের দুই কবির কলমে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর দুই কবিতার
পাঠ অনুভব পত্রস্থ হলো...
স্বকালের অন্ধকারে
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
স্বকাল তোমার অন্ধকারে ডুবছি আবার।
স্বকাল তোমার অন্ধকারের অতল তলে
                    মন হারালাম-

মন তো আমার অচিন পাখি, শূন্যে বসত,
মন তো আমার একলা রাখাল বিরান বিলে।
                    ঘর বানালাম

নড়বড়ে আট খুঁটির 'পরে খড়ের ছাওন,
জান্‌লা-দুয়োর, কব্জা-কবাট নেই সে ঘরে।
                  উদোম হাওয়া

কী দিন কী রাত এদিক থেকে অন্য দিকের 
শূন্যতা ছোঁয়, অপূর্ণতার বাউল রাতে
                     কান্দে শরীর-

স্বকাল তোমার সকল তনু-তীর হারালাম।
স্বকাল তোমার শূন্যতাতে ঝাঁপ দিয়েছি
সকাল বেলায়
শূন্যতা ও বাউলিপনায় অবগাহন
ওবায়েদ আকাশ
প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, কবিতাটি অনুভূতিতে ধাক্কা দিয়ে গেলে সেখান থেকে পাই-টু-পাই বুঝে নেবার দরকার পড়ে না। কবিতা তা কখনও দেবে না পাঠককে। তবে পাঠককে সে এমনভাবে বিদ্ধ করবে, স্বেদাক্ত করবে যে, তাঁকে দীর্ঘদিন সেই রহস্যশিরা ছিঁড়তে ব্যস্ত রাখবে। আবার কিছু কবিতা থাকে, যা অনায়াসে একটা ফয়সালা করে দেয়। সুতরাং কবিতা সম্পর্কে, এমনকি শিল্প সম্পর্কেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে কিছু নেই। 
জনপ্রিয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এক নিবিড় বুননে পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে আছেন। তাঁর পাঠকপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। আবার তাঁর সমালোচকের সংখ্যাও কম নয়। তিনি সমালোচনায় কখনও মহার্ঘ আবার কখনও তীরবিদ্ধ। কারণ তাঁর একটি কাব্যভাষা আছে; যা তিনি দীর্ঘ সময়ে নির্মাণ করেছেন। আর শিল্পের পরিণতির ক্ষেত্রে তীরবিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারটা সহজাত অর্থেই বিবেচ্য। আলোচ্য কবিতাটি রুদ্রের একটি অন্যধারার কবিতা। রুদ্রকে কিছুটা মরমি ধারার কবি মনে হলেও মূলত রাজনীতি, প্রেম ও বিষাদ-বিরহ তাঁর পরিচিতির ক্ষেত্রে অধিক বিস্তারী। দেহতত্ত্ব ও মরমিবাদ যে রুদ্রকে, তাঁর ভেতরের আরেক রুদ্রকে পরিচয় করিয়ে দেয়, সেখান থেকে পাঠকের মুক্তি নেই। আলোচ্য কবিতায়ও আমরা কবিকে একইভাবে আবিস্কার করি। আকাশ ও শূন্যতা, অজানা ও বাউলিপনা এই কবিতার অনিবার্য ডেসটিনি। আবার রুদ্রের প্রকৃত কবিসত্তাকে খুঁজতে গেলেও আমাদের আকাশ ভ্রমণের প্রয়োজন পড়ে। 
কবি স্বকালের অন্ধকারে ডুবে গেছেন বলে ধারণা করছেন, তাঁর মনও হারিয়েছে স্বকালের মোহে। কিন্তু তাঁর একটা বাউলমন আছে, তাঁর একটি ঘরছাড়া মন আছে; সেটাকে তিনি ইচ্ছেমতো উড়তে দিতে পারছেন না। 
তিনি দেহব্যাখ্যায় বিন্যস্ত করেছেন পঙ্‌ক্তিমালা। নড়বড়ে আটটা খুঁটির ঘরে আবাস তাঁর মনের। যা শূন্যতা ছোঁয়, অপূর্ণতায় কেঁদে কেঁদে ভারী করে বাউলরাত। কারণ, কবি স্বকালের অন্ধকারে ডুব দিয়েছেন। কিন্তু স্বকাল বা তাঁর সময়কে বা কবির সমসময়কে অনেক অর্থপূর্ণ মনে করেন, তাঁকে আলোকিত মনে করেন। মনে করেন তার একটা সদর্থকতা আছে। তার অপার সম্ভাবনা আছে। এই সময়ের সদ্ব্যবহার না করতে পারলে সকলই হারাতে হবে। তাই কবিমুখে উচ্চারিত হয় 'স্বকাল তোমার সকল তনু-তীর হারালাম।'
শূন্যতা যেমন হাহাকার আবার সেই শূন্যতাই অনন্ত আকাশ। সেই শূন্যতাই অসীমতা। একদিন সকালবেলা তিনি সেই শূন্যতায় ঝাঁপ দিয়ে বিলীন হয়ে যান। এখানে কবি 'স্বকাল' এবং 'সকাল'-এর একটা অনন্য শব্দমিথুন তৈরি করেছেন- যা তাঁর কবিত্বশক্তিকে ইঙ্গিত করে।
প্রকৃতার্থে 'স্বকালের অন্ধকারে' কবিতাটিতে তিনি তাঁর নিজের সময়কে বিদ্ধ করেছেন। নিজের সময়ের ব্যবচ্ছেদ করেছেন এবং নিজের কৃতকর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। 
আপাত অর্থে এমন কবিতার একটি পারফেক্ট ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সহজ কাজ নয়। আসলে সেটা সম্ভবও নয়। কারণ কবিতার থাকে বহুমুখ। তিনি যে অধ্যাত্ম চেতনা বা মরমিবাদের ভিতর দিয়ে নিজেকে মেপে নিলেন স্বকালের চেতনায়, তার অর্থ গভীর থেকে গভীরে প্রোথিত। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর গভীরতর চেতনা-ভাষাকে অগ্রাহ্য করা কিছুতে সম্ভব নয়। বর্তমান কবিতাটি তাই রুদ্রের একটি শনাক্তকারী কবিতা বলে বিবেচিত হতে পারে।
* কবিতাটি তাঁর 'মৌলিক মুখোশ' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।

অবেলায় শংখধ্বনি
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
অতোটা হৃদয় প্রয়োজন নেই,
কিছুটা শরীর কিছুটা মাংশ মাধবীও চাই।
এতোটা গ্রহণ এতো প্রশংসা প্রয়োজন নেই
কিছুটা আঘাত অবহেলা চাই প্রত্যাখ্যান।
সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয়
জীবন কিছুটা যাতনা শেখায়
ক্ষুধা ও খরার এই অবেলায়
অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই।

বুকে ঘৃণা নিয়ে নীলিমার কথা
অনাহারে ভোগা মানুষের ব্যথা
প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই-
করুণা কাতর বিনীত বাহুরা ফিরে যাও ঘরে।

নষ্ট যুবক ভ্রষ্ট আঁধারে কাঁদো কিছুদিন
কিছুদিন বিষে দহনে দ্বিধায় নিজেকে পোড়াও
না হলে মাটির মমতা তোমাকে হবে না সুঠাম
না হলে আঁধার আরো কিছুদিন ভাসাবে তোমাকে।

অতোটা প্রেমের প্রয়োজন নেই
ভাষাহীন মুখ নিরীহ জীবন
প্রয়োজন নেই-প্রয়োজন নেই

কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই, কিছুটা আঘাত
রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই
চাই কিছু লাল তীব্র আগুন।


ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেকে
তুষার কবির
কেবল হৃদয়ের জলের মতন কথাই সব সময় কবিতা না! কবিতায় কখনও কখনও 'পাঁজরে পুষ্পের ঘ্রাণ' যেমন ছড়িয়ে পড়ে; ঘুমন্ত ঘুঙুর যেমন বেজে ওঠে- আবার কখনওবা সেই কবিতাতেই কাচের গেলাশে উপচানো মদ গড়িয়ে পড়ে; ভ্রষ্ট পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে 'বিষ বিরিক্ষের বীজ'! আর তাইতো সত্তর দশকের উচ্চকিত স্বর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে সরল-কাতর-মৃদু-থরোথরো-প্রেমভারাতুর কোমলতায় বলে ওঠেন- 'চলে গেলে মনে হয় তুমি এসেছিলে, চলে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভুবনে আছো' বা 'দূরত্ব জানে শুধু একদিন খুব বেশি নিকটে ছিলাম' বা 'আমি সেই নতমুখ, পাথরের নিচের করুণ বেদনার জল, আমি সেই অভিমান আমাকে গ্রহণ করো'! আবার তাঁর কবিতাতেই উঠে আসে চেতনাপীড়ক-টালমাটাল-উন্মত্ত শব্দরাশি- 'দংশন করো একাধিকবার দংশন চাই বিষ' বা 'নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান' বা 'যে নারী সিঁথায় লাল সিঁদুরের স্নিগ্ধ প্রেমে এঁকেছিল মুগ্ধ নীড় সে আর ফিরবে না।' ফলে কবিতার এই কুহক ছড়ানো প্যারাডক্সে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ যেমন বারবার হেঁটে গিয়েছেন বাগ্‌দেবীর দরজায়; সেই সাথে পাঠকও সম্মোহিত হয়ে ছুটে গিয়েছেন তাঁর কবিতার জানালায়! বলা যায়, কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর জীবদ্দশায় সাতটি কাব্যগ্রন্থ- 'উপদ্রুত উপকূল', 'ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম',
'মানুষের মানচিত্র', 'ছোবল', 'গল্প', 'দিয়েছিলে সকল আকাশ' ও 'মৌলিক মুখোশ'- এই কবিতার বইগুলোতে তাঁর স্বরকে জানান দিয়েছেন কখনওবা পেলব প্রেমময়তায়, আবার কখনও সেটি প্রকাশ পেয়েছে মিছিল কাঁপানো গনগনে স্লোগানে! রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় উঠে আসে ক্ষুধা-প্রেম-আগুন-মাটি-মদ-মাংস-রৌদ্র-যুদ্ধ-রক্ত-রিরংসার এক অভিনব রসায়ন! 'অবেলায় শংখধ্বনি'-কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর একটি ভিন্নধর্মী কবিতা, যাতে কবি নিজেই ঘুরপাক খেয়েছেন এই ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেকে! 'অতোটা হৃদয় প্রয়োজন নেই, কিছুটা শরীর কিছুটা মাংস মাধবীও চাই'! রুদ্র যেন মনে করিয়ে দেন 'আমি তারে ভালোবাসি অস্থিমাংস সহ'-কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাসের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তিটি! এ কবিতাটিতে নিছক অতীন্দ্রিয় প্রেমে কবি আচ্ছন্ন নন; কবি জানেন প্রায়োগিক এ পৃথিবীতে রক্তমাংসের উপযোগিতা, শরীরী ভাষার আবেদন! ক্ষুধা ও খরাপীড়িত রুদ্র কবিতাটিতে আবারও বলে ওঠেন 'অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই'! কবির মর্মচেরা বয়ান এভাবে উচ্চারিত হয় 'নষ্ট যুবক ভ্রষ্ট আঁধারে কাঁদো কিছুদিন/ কিছুদিন বিষে দহনে দ্বিধায় নিজেকে পোড়াও/ না হলে মাটির মমতা তোমাতে হবে না সুঠাম,/ না হলে আঁধার আরো কিছুদিন ভাসাবে তোমাকে!' রক্ত, স্বেদ, যুদ্ধ, রিরংসায় ঠাসা এ প্রেমহীন পৃথিবীতে কবি পরিশেষে কামনা করেন উত্তাপ উষ্ণতা, তীব্র লাল আগুন- 'কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত/ রক্তের কিছুটা উত্তাপ চাই উষ্ণতা চাই/ চাই কিছু লাল তীব্র আগুন!'

আরও পড়ুন

×