বুক চিতিয়ে সুন্দরবন আছে বারোমাস

প্রকৃতি

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম আর খায়রুল উমাম

সুন্দরবন পৃথিবীর এক অনন্য প্রাকৃতিক বন। একসময় এর বিস্তৃতি ছিল বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর ও যশোর জেলা পর্যন্ত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতি স্থাপন ও বন কেটে কৃষিজমি আবাদের কারণে সুন্দরবনের আয়তন ক্রমশ ছোট হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সত্ত্বেও সুন্দরবনের আয়তনে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; কিন্তু বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অমানবিক ক্রিয়াকলাপের কারণে দিন দিন বিপন্ন হয়ে পড়ছে সুন্দরবন। একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝড়ের প্রকোপ বেড়েছে; পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে; মিষ্টি পানির প্রবাহ কমেছে; অন্যদিকে অবৈধ শিকারি ও সম্পদ আহরণকারী বেড়েছে; এই এলাকা বেআইনি অস্ত্রধারীদের স্বর্গরাজ্য হয়েছে; মোংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে যাতায়াত বেড়েছে। এসবই সুন্দরবনকে বিপন্ন করতে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন ও উদ্বেগজনক সংযোজন। সমকাল পত্রিকায় জুন মাসে একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থা। এ ছাড়াও পশুর নদীর পাশে সিমেন্ট কারখানা, এলপি গ্যাস, তেল শোধনাগার, তেল-সারের গুদাম, জাহাজ ভাঙা শিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের মাঝারি ও ভারী শিল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব শিল্পের কোনোটাই সুন্দরবনের জন্য কম ক্ষতির কারণ হবে না।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে কয়লার ব্যবহার বিশ্বস্বীকৃতি। উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশই তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিংহভাগ ক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করে। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সীমিত হওয়ার কারণে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিকল্প নেই। কিন্তু স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেশের ভূপ্রকৃতি, নদী, বনভূমি, পরিবেশ সর্বোপরি মানুষকে রক্ষার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা প্রকাশ পাবে। সেটাই সাধারণ মানুষের একমাত্র কাম্য। সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টিকারী মোংলা সমুদ্রবন্দর, মোংলা ইপিজেডসহ সরকারি-বেসরকারি শিল্প এবং রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমন্বিত প্রভাবের রূপ আমরা জানি না। পরিবেশবাদীরা শুধু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রভাব নিয়ে আন্দোলন করছেন। সব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিবেচনায় নিলে তা যে আরও প্রকট হয়ে উঠবে; সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরিবেশবাদী বিশেষজ্ঞদের দাবি- সুন্দরবনের কাছে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে এর থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন, সালফারসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ বাতাসের মাধ্যমে সুন্দরবনের ক্ষতিসাধন করবে। কেন্দ্র থেকে নির্গত পানি সুন্দরবনের নদী দূষিত করবে। বিভিন্ন জাহাজ চলাচলে বন্যপ্রাণীর জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটাবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে এখানে নগরায়ণ হবে, যা উদ্বেগের বিষয়। সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিপন্ন করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার পরিবেশবাদীরা সুন্দরবন বিনষ্ট হলে গোটা জাতিকে মাসুল দিতে হবে বলে দাবি করছেন। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিচারে বিদ্যুৎ উৎপাদন অবশ্যই বাড়াতে হবে। কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে কোনো অবস্থাতেই তা সুন্দরবনের মতো অমূল্য সম্পদের বিনিময়ে নয়। সুন্দরবন আমাদের অহঙ্কার।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে। তবে দূষণের শঙ্কাও কাটছে না। আমরা যেন বিস্মৃত হয়েছি- বাংলাদেশের মানুষের কাছে সুন্দরবন অহঙ্কার। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে সুন্দরবন অহঙ্কারের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঢালও। আজন্ম সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে এ অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করে চলেছে সর্বংসহার মতো। সাম্প্রতিককালে উপকূলে আঘাত করা ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল' শুধু নয়, এর আগেও 'ফণী', 'আইলা', 'সিডর'সহ অন্যান্য ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সম্ভাব্য ক্ষতিকে বুকে ধারণ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ ও সম্পদকে রক্ষা করেছে সুন্দরবন। আর আমরা? কৃতঘ্নতার সর্বোত্তম প্রমাণ দিয়েই চলেছি!

সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। নদী, খাল, সবুজ, জীববৈচিত্র্য ও জঙ্গল নিয়ে এ বনের বৈচিত্র্য। এই বন বিশ্বঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে সুন্দরবন নানাভাবে ধ্বংস হচ্ছে। কাগজে-কলমে সবকিছুই যেন কাজির খাতায় আছে। প্রকৃতির অপরূপ দান মানুষের লিপ্সার কাছে হার মেনে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ১৮৭৮ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর এক বছর পর সুন্দরবনকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সরকারি সম্পত্তির স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় চরম ভোগের কার্যক্রম। বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থলিপ্সা, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের সম্পদ আহরণ; জলদস্যু, ডাকাত, সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেললেও তা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যক্রম আজ পর্যন্ত দেখা যায় না। বরং প্রতিনিয়ত আমরা সুন্দরবন ধ্বংসে আরও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছি। শুধু বিশাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনই নয়; এ কেন্দ্রকে ঘিরে একটা বিশাল শিল্প এলাকা গড়ে তোলার প্রস্তুতিও পুরোদমে চলছে। ২০১৮ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আদালতে উপস্থাপিত এক নথিতে আরও জানা যায়, সুন্দরবনের আশপাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৯০টি শিল্পকারখানা স্থাপনের বৈধ অনুমতির কথা, যা অদূর ভবিষ্যতে খাঁড়ার ঘায়ের মতোই প্রতীয়মান হবে। কারণ এ সুযোগে দেশের প্রায় দেড়শ' শিল্পপতি ইতোমধ্যে সুন্দরবন এলাকায় বিশাল বিশাল জমি ক্রয় করে শিল্প স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছেন। তাই আশঙ্কা করা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবনকে হারিয়ে ফেলা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এ অঞ্চলের মানুষ ভবদহ দেখেছে। যেখানে পোল্ডার আর স্লুইস গেট নির্মাণ করে তাদের ব্যাপক ফসল উৎপন্ন করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। সোনার কাস্তে দিয়ে ফসল কাটার উৎসব এলাকার মানুষ দেখেছে। এ আনন্দের জোয়ার কতদিন বহাল ছিল? এক দশকের আনন্দ প্রকৃতির রুদ্ররোষে চরম দুঃখে রূপান্তরিত হয়েছে। আজ কয়েক দশক ধরে মানুষ পানিবন্দি। সেই পোল্ডার আর স্লুইস গেট নির্মাণকারী ফসলে গোলা ভরে দেওয়া মানুষদের প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের ভোগান্তি এলাকাবাসীকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেও তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়ে গেছে। কোনো দায়বদ্ধতা নেই, জবাবদিহিও নেই। মানুষ মুক্তির জন্য চিৎকার করে, আর এরা নতুন করে শত শত কোটি টাকার ব্যবসার ফাঁদ পাতে। সুন্দরবনের পাশে নির্মাণাধীন রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রও একই পথে চলেছে।

ব্রিটিশরা ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি অনুসরণ করে ভারতবর্ষ শাসন করেছে। এখনকার স্বজাতির একই ধারাবাহিকতার শাসনে দেশের সব পেশাজীবী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত। সর্বত্র দেশ ও জাতির আগে দল স্থান করে নিয়েছে। ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে দল সর্বাগ্রে। সারাজীবনের অর্জন বিসর্জনে কুণ্ঠা দেখা যাচ্ছে না কারও। সে কারণে দেশ ও জাতির কল্যাণের আন্দোলন-সংগ্রাম স্তিমিত।

আমাদের মন্ত্রীরা সুন্দর সুন্দর কথা বলে মাঝেমধ্যে জনগণকে তাক লাগিয়ে দিয়ে থাকেন। যেমন ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পর সুন্দরবন রক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের চিন্তা এসেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর। পরিবেশবাদীদের আবেদন আমলে না নিলেও বুলবুল তাদের মনে করে দিয়েছে সুন্দরবনকে নতুন করে রক্ষা করার কথা। তাই এখন অপেক্ষার পালা। এ কথা নিশ্চিত- সুন্দরবনকে এখন ধ্বংসের পথে এগিয়ে দিয়ে আগামীতে তা রক্ষার জন্য নতুন করে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প জনগণ পাবে। ইতোমধ্যে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প আসছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ।

তাই সুন্দরবন যতই বিপন্ন হোক; দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ যতই নিরাপত্তা হারাক; এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকায় প্রভাব পড়ূক; পরিবেশ রুষ্ট হোক; জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হোক; পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন নষ্ট হয়ে যাক; বিশ্বঐতিহ্য মুছে যাক- এতে উন্নয়ন থেমে থাকতে পারে না। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হবেই। মতার বলয় আজ পরিবেশবাদীদের কোনো কথা শুনতে চাইছে না। তবে কালের যাত্রার ধ্বনি তাদের শুনতেই হবে।

প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]