ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

লাতিন 'গোলাপি ঢেউ' থেকে বঙ্গীয় বামপন্থিদের শিক্ষণীয়

লাতিন 'গোলাপি ঢেউ' থেকে বঙ্গীয় বামপন্থিদের শিক্ষণীয়
×

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

এক বছরেরও কম সময়ে লাতিন আমেরিকার তিনটি দেশে বামপন্থিরা ক্ষমতায় এসে গেল। শুরুটা হয়েছিল চিলি দিয়ে। তারপর কলম্বিয়া। আর শেষ হলো বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল দিয়ে। সাবেক মেটাল শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট ও বামপন্থি রাজনীতিক ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা লুলা দ্য সিলভা তৃতীয়বারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। অবশ্য দ্বিতীয়বারের পর বেশ কিছুটা সময় তাঁকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছিল।
ব্রাজিলে লুলা দ্য সিলভার বিজয়ে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বামপন্থিরাও উল্লসিত। উল্লেখ্য, ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম রাউন্ড নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী দাঁড় করালেও দ্বিতীয় রাউন্ডে এসে লুলার প্রেসিডেন্সিকে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, গোটা লাতিন আমেরিকা এখন বাম পন্থার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। সে কারণেই হয়তো ব্রাজিলে লুলার বিজয়ে গোটা বিশ্বের বামপন্থিরা উদ্বেলিত-উল্লসিত; যেমন হয়েছিল চিলির নির্বাচনে বরিসের বিজয়ে। কিন্তু ভেনিজুয়েলা আর কিউবার কথা বাদ দিলে লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে বামপন্থিরা ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁরা কতটুকু বাম আদর্শকে সম্বল করে আর কতটুকু সেসব দেশে বিরাজমান আর্থসামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে; তা বিবেচনার দাবি রাখে। সেই বিবেচনা থেকেই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বামপন্থিদের আগামী দিনে তাঁদের পথ বেছে নিতে হবে।
গত এক দশকে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যা ঘটেছে, তাকে অনেকেই ধনবাদী 'ব্লু টাইড' বা নীল ঢেউয়ের বিপরীতে 'পিঙ্ক টাইড' বা গোলাপি ঢেউ বলতে চান; সরাসরি লাল নয়। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। যেসব দেশে বামপন্থিরা ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁরা চরিত্রগতভাবে বামপন্থির চেয়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটই বেশি। চিলি কিংবা ব্রাজিলও তার ব্যতিক্রম নয়।
এ কথা সুবিদিত- ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারো সর্বক্ষেত্রে নিজেকে প্রায় অপরাজিত ভাবতেন। তাঁর অতি দক্ষিণপন্থি রাজনীতি যে এক সময় মুখ থুবড়ে পড়বে বা পড়তে পারে- এমনটা তাঁর বা দলের কারও দূরতম কল্পনায়ও আসেনি। কভিড মোকাবিলাসহ অর্থনীতির প্রায় সর্বক্ষেত্রে কোনো ব্যর্থতাকেই বলসোনারো স্বীকার করেননি। উল্টো নির্বিচারে ধ্বংস করেছেন অ্যামাজন। তাঁর আমলে দেশের মানুষের আয়বৈষম্য বেড়েছে কয়েক গুণ। দেশের সম্পদের অধিকাংশ কুক্ষিগত হয়েছে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জনগণকে বঞ্চিত করে দক্ষিণাঞ্চলীয় মানুষের মনোরঞ্জনের দিকে বলসোনারো মনোযোগ দিয়েছিলেন বেশি; পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেমনটি করেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে। সব মিলিয়ে বলসোনারোর অতিরিক্ত পুঁজিপ্রীতি এবং উত্তরাঞ্চলের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ সাধারণ মানুষকে তাঁর প্রশাসন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তারই অনিবার্য ফল ব্রাজিলের বাম জাগরণ।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে- ব্রাজিলে বাম জাগরণ যত না আদর্শের টানে, তার চেয়ে বেশি বিকল্পের সন্ধানে। অন্য কথায় বলা যেতে পারে, প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা থেকেই মানুষ একটি বিকল্পের সন্ধান করেছে। লুলা তথা ব্রাজিলের বামপন্থিরা নিজেকে সেই বিকল্প হিসেবে মানুষের কাছে তুলে ধরতে পেরেছেন। অর্থাৎ আদর্শগত পরিবর্তন নয়; বাস্তব চাহিদার নিরিখেই বিকল্প হিসেবে জাগরণ বাম পন্থার। এর প্রমাণ মেলে ভোটের ফলাফলে।


লুলা তাঁর দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় অ্যামাজন এলাকায় ভোট পেয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। এর একটি প্রধান কারণ, বলসোনারো সরকারের আমলে এ অঞ্চলের মানুষ প্রবল বঞ্চনা আর শোষণের শিকার হয়েছিল। সঙ্গে যোগ হয়েছিল হাজার বছরের ঐতিহ্য অ্যামাজন বনাঞ্চল ধ্বংসের উৎসব। লুলা সে বিষয়কেই তাঁর নির্বাচনে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যেমনটি করেছিলেন চিলির প্রেসিডেন্ট বরিস তাঁর দেশের আয়বৈষম্যের বিষয়টিকে। তাঁরা নিছক বাম পন্থার দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের কাছে যাননি। গিয়েছেন সময়ের প্রয়োজন আর স্লোগান নিয়ে।
অস্বীকার করা যাবে না, বরিসও বামপন্থি। কিন্তু যেসব দাবি বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি চিলির রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে এবং সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন, তা হলো- সামাজিক অসাম্য দূরীকরণসহ কিছু আশু ও জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের প্রতিবাদী মুখ বরিস চিলির তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেকে তুলে ধরেছেন একজন স্ট্রিট ফাইটার হিসেবে। স্বৈরতান্ত্রিক সময়ের সংবিধান বাতিলের দাবিতে গণআন্দোলনে সামনের সারিতে থেকেছেন বরিস। সেই গণআন্দোলনের আবহেই জন্ম নিয়েছিল নতুন জোট। যে জোটে চিলির কমিউনিস্ট পার্টিও ছিল শরিক দল। সেই জোটের নেতা হয়েছেন গাব্রিয়েল বরিস।
সময়ের প্রয়োজন অনুধাবনেই লাতিন আমেরিকার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন আমাদের বামপন্থিরা। সময়ের ভাষা ও স্লোগানকে ধারণ করতে তাঁরা বরাবরই শ্নথ। তাই তো দেখি স্বাধীনতা-পূর্বকালে মানুষ যখন পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় নিজেদের অস্তিত্বের সন্ধান করছে; আমাদের বামপন্থিরা তখন ভলগা আর গঙ্গাতে অবগাহনে ব্যস্ত। এর সুযোগ নিয়েছেন পুঁজিবাদের পূজারি জাতীয়তাবাদীরা। এ কথাই কয়েক দিন আগে শ্রদ্ধেয় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন- পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের ওপর শোষণ চালাচ্ছে, আমাদের বামপন্থিরা স্লোগান দিয়েছে- জয় সর্বহারা। অথচ জাতীয়তাবাদীরা 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়ে জনগণকে তাদের বলয়ে নিয়ে গেছে। (সমকাল, ১ নভেম্বর, ২০২২)।
এ তো গেল পাঁচ দশক আগের কথা। দুই দশক ধরে আমাদের বামপন্থিরা আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বিদলীয় বৃত্তের বাইরে বিকল্প শক্তির উত্থানের কথা বলে আসছেন। কিন্তু দেশে আন্দোলন-সংগ্রামের অগণিত ইস্যু বিদ্যমান সত্ত্বেও কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হননি। ফলে বিকল্পও গড়ে ওঠেনি। এখন পর্যন্ত আমাদের বামপন্থিরা এমন একটা স্লোগান তৈরি করতে পারেননি, যার সঙ্গে দেশের আপামর মানুষ গলা মেলাতে পারে। আমরা বদহজমের রোগীকে ভিটামিন খাওয়ার পরামর্শ দিই, যা প্রকারান্তরে তার অসুখ বাড়িয়েই চলে। যখনই কোনো সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখনই শুরু হয়ে যায় তত্ত্ব ঘাঁটা- কোন ময়লায় গন্ধ বেশি, কোনটাতে কম। আমাদের দেশের বামপন্থিরা ইতিহাসের এই সত্যিটা অনুধাবন করতে পারছেন না- তত্ত্ব দিয়ে বিকল্প তৈরি হয় না। বিকল্প তৈরি হয় মাঠ থেকে; আন্দোলনের পথ বেয়ে। ব্রাজিল, চিলি তা-ই শিখিয়েছে।
মনে রাখতে হবে, চিলি অথবা ব্রাজিলে যাঁরা বরিস কিংবা লুলাকে ক্ষমতায় এনেছেন, তাঁরা কিন্তু সবাই কমিউনিস্ট নন; কেউ কেউ শুধু বামঘেঁষা। তারপরও ওখানকার কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমমনা এবং সমলক্ষ্যে ক্রিয়াশীল সব দলকে নিয়ে নির্বাচনী ফ্রন্ট তৈরি করে সামনে এগিয়ে গেছে। আমাদেরও সময় এসেছে চিলি কিংবা ব্রাজিল থেকে শিক্ষা নিয়ে কর্মপদ্ধতি স্থির করার। ঢেউয়ের রং গোলাপি কিংবা লাল যা-ই হোক; আমাদের দরকার এখন লুলার মতো প্রাজ্ঞ ও জীবনসংগ্রামে ঋদ্ধ একজন নেতা কিংবা বরিসের মতো একজন স্ট্রিট ফাইটার। অন্যথায় রাজনীতিতে বিদ্যমান আঁধার শুধুই প্রলম্বিত হবে। সেই সঙ্গে প্রলম্বিত হবে কর্তৃত্ববাদী শাসন।
মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা
moshtaque@gmail.com

আরও পড়ুন

×