ইসলাম ও সমাজ
কোরবানি চাই আল্লাহর রাহে
মোহাম্মদ শাহ জালাল
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের দ্বিতীয় খুশির দিন। তবে দিনটি শুধু আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠতে বলে না; বরং ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা ধারণেও উদ্বুদ্ধ করে। এ উৎসবে মুসলমান খুঁজে পায় আত্মোৎসর্গে বিলীন হওয়ার অবারিত পথ। বাংলাদেশে এ ঈদে যত গবাদি পশু কোরবানি হয়, তা সারাবছর জবাইকৃত পশুর প্রায় ৪৯ শতাংশ। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কতটুকু আন্তরিকতা নিয়ে এ কাজ করছি, নাকি শুধুই নিয়ম রক্ষা কিংবা নাম কামানো বা আত্মম্ভরিতা প্রকাশের জন্যই এ উৎসবে শামিল হচ্ছি?
আত্মত্যাগের মহান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কোরবানি করলে কিছু আত্মজিজ্ঞাসায় মগ্ন হতে হবে। প্রথম কথা হলো, আত্মত্যাগ আমরা চাই কিনা? যদি জবাব ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে অবশ্যই প্রশ্ন আসে– কোন পদ্ধতিতে চাই? নিজের মনমতো, না আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাঠামোতে? যদি শেষোক্তটাই জবাব হয় তবে ভাবতে হবে, আসলে কতদূর সত্য কথা আমি বলছি। কোরবানি একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হতে হবে। এতে সামান্যতম খাদ বা ভেজাল থাকলে শুধু মাংস খাওয়াই সার হবে; কোরবানি হবে না।
এবার আসা যাক আনুষঙ্গিক বিষয়ে। অনেক ক্ষেত্রে যেভাবে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বেশি দামের পশু ক্রয় করে পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হয়, তা কি সংগত, নাকি নিজের বিত্তবৈভবের বাহাদুরি প্রদর্শনই মূল লক্ষ্য! নইলে পাঁচ-সাতটা গরু কোরবানি করেও সবটুকু ভালো মাংস ফ্রিজে চলে যায় কী করে? অথচ পাশেই অপেক্ষা করতে থাকে ক্ষুধার্ত ও বঞ্চিত মানুষের দল।
কোরবানির আসল লক্ষ্যই হলো আমিত্বকে মিটিয়ে দিয়ে কেবল খোদার রাহে নিজেকে সঁপে দেওয়া। সংকীর্ণতা, দীনতা, হীনতা, অহংকার, বড়াই, স্বার্থবাদিতার আগুন নিভিয়ে দিয়ে পূত-পবিত্র হতেই শিক্ষা পাই কোরবানি থেকে। এগুলোই যদি দূর করা না গেল, তবে কী ফায়দা পশু হত্যায়? পশুর হাটে অজস্র মানুষের আনাগোনা। ঈদুল আজহার নামাজ শেষে ছোটাছুটি আরম্ভ হয়ে যায় পশু জবাইয়ের জন্য। ঈদের পর পাঁচ-সাত-দশ দিন পশুর মল-মূত্র ও অখাদ্য নাড়িভুঁড়ির গন্ধে রাস্তা দিয়ে হাঁটা দায়। চামড়া ব্যবসায়ীরা এক সপ্তাহেই অর্ধেক বছরের লাভ আদায় করে নেয়। কত আগেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গেছেন– ‘মনের পশুরে করো জবাই,/ পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।’ “ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’, শক্তির উদ্বোধন।”
এই সত্যাগ্রহ, শক্তির উদ্বোধন ঘটাতে হলে চাই বনের পশুর সঙ্গে মনের পশুরও কোরবানি। তবেই আমরা মহান আল্লাহর এ বাণী বুঝতে সক্ষম হবো। ‘আল্লাহর কাছে তাঁর কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং তোমাদের সংযমই পৌঁছে।’
পবিত্র কোরবানির দিনে আমাদের মনে রাখতে হবে– কিছুতেই আমরা যেন গতানুগতিক প্রথা মেনে পশু কোরবানি দিয়ে আত্মতৃপ্তিতে গা না ভাসাই। আমাদের চৈতন্যজুড়ে অবশ্যই খোদাপ্রেমের অন্তঃসলিলা ফল্গুধারা নিঃসৃত করতে সচেতন থাকতে হবে। নতুবা এ শ্রম পণ্ড হতে বাধ্য। আল্লাহ আমাদের তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন।
অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ শাহ জালাল: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; আহ্বায়ক, সুফিবাদী নাগরিক মজলিস-সুনাম
- বিষয় :
- ইসলাম ও সমাজ
- মোহাম্মদ শাহ জালাল