দেশের ১০টি নদীর ‘এসওএস’ গবেষণার ফল এবং নীতিগত করণীয়
লাল রঙ নদীর প্রবাহের বিপজ্জনক অবস্থা নির্দেশ করে। হলুদ এবং সবুজ রঙ যথাক্রমে নদীর প্রবাহের সতর্ক এবং নিরাপদ অবস্থা নির্দেশ করে। তবে এই গবেষণার ফল অনুসারে, কোনো নদীর প্রবাহই সেফ অপারেটিং স্পেসের মধ্যে নেই। গঙ্গা (শুষ্ক মৌসুম), পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ চারটি প্র
আলমগীর কবীর, শেখ রোকন, মো. মাহমুদুল হাসান, হাসান মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও মো. সারওয়ার হোসেন
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। এটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পানি সংকটের মধ্যে বাস করছে। বিশেষত বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ, ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-নাজুক ব-দ্বীপ। এই গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ১০টি প্রধান নদ-নদীর প্রবাহের ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি, স্থানিক ও কালিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘এসওএস’ (সেফ অপারেটিং স্পেস) বা নিরাপদ প্রবাহ পরিসর ধারণা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য নীতিগত পরামর্শ প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে।
সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার ঠিক আগের স্তরকে নিরাপদ প্রবাহ পরিসর বলা হয়, যে পরিস্থিতিতে মানুষ নিরাপদে বসবাস ও বিকাশ লাভ করতে পারে। আর পরিস্থিতি এর বাইরে চলে গেলে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। সময় পরিক্রমা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শীতকাল ছাড়া বিগত তিন দশকে সব ঋতুতে দেশের নদীর প্রবাহ ছিল হ্রাসমান। প্রবাহবৈচিত্র্যের পরিসীমা পদ্ধতি ব্যবহার করে হাইড্রোলজিক্যাল পরিবর্তন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গঙ্গা, যমুনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ দেশের অধিকাংশ নদীর প্রবাহ উচ্চ থেকে মারাত্মক পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টি নদীর মধ্যে চারটি, গঙ্গা (শুষ্ক মৌসুমে), গড়াই, হালদা ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নিরাপদ প্রবাহ পরিসরের সীমা অতিক্রম করেছে। বাকি ছয়টি নদী– যমুনা, তিস্তা, আত্রাই, সুরমা, কুশিয়ারা ও ইছামতী সতর্কতামূলক অবস্থানে। কারণ সেখানে মধ্যম থেকে মারাত্মক পর্যায়ে হাইড্রোলজিক্যাল পরিবর্তন হয়েছে। এই গবেষণায় এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন বিরোধ মেটাতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ক নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
২. প্রেক্ষাপট
প্রাকৃতিক বন সৃজন থেকে মানব বসতি পর্যন্ত প্রায় সবকিছু তৈরিতে ভূমিকা রাখায় নদী পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত। সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিশ্বের বৃহৎ প্লাবন সমভূমিগুলোতে বর্তমানে প্রায় ২৭০ কোটি মানুষ বসবাস করে; তার মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি মানুষের বসবাস বৃহৎ ব-দ্বীপগুলোতে। তবে মানব উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সত্ত্বেও মানবসৃষ্ট কারণেই, যেমন বাঁধ নির্মাণ বা মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলন, বিশ্বজুড়ে নদ-নদীর প্রতিবেশ ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন নদী প্রবাহের পরিমাণ ও মান এবং ঋতুভিত্তিক স্বাভাবিকতা বদলে দিয়ে প্রতিবেশ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে খরার ক্রমবর্ধমান পরম্পরায় বহু নদী শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী পানিসম্পদের জন্য উচ্চতর হুমকি সৃষ্টি করবে।
বস্তুত পানিসম্পদের বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতা ইতোমধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় পানির অপ্রাপ্যতা, পানিসম্পদে কম প্রবেশাধিকার, পানির অসন্তোষজনক মান, পানি সম্পর্কিত মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ স্থায়ীভাবে পানিজনিত নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। পরিমাণ ও মানগত উভয়ের দিক থেকে পানিস্বল্পতাজনিত সংকট ভবিষ্যতে আরও তীব্র হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ সংকট বিশ্বব্যাপী নদী অববাহিকায় বসবাসকারী ৩০০ কোটির বেশি মানুষকে প্রভাবিত করবে। ২০১০ দশকের শুরুর দিকে ১৯০ কোটি মানুষ পানিস্বল্পতার সম্ভাব্য গুরুতর সংকটে বসবাস করত। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ২৭০ থেকে ৩২০ কোটিতে দাঁড়াবে।
সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলোতে কেবল এটাই দেখানো হয়নি যে, বৈশ্বিক মিঠাপানির ব্যবহার নিরাপদ প্রবাহ পরিসর লঙ্ঘন করেছে। এটাও দেখানো হয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বব্যাপী পানিসম্পদ নিয়ে বিরোধ ৩ থেকে ৯ গুণ পর্যন্ত হয়েছে। বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চ সংঘাতময় এলাকার অন্তর্ভুক্ত। কারণ বার্ষিক পানিপ্রবাহের উচ্চতম এলাকার অন্তর্ভুক্ত হলেও এ অঞ্চলে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দ্বন্দ্ব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষির প্রসার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাঁধ নির্মাণের কারণে পানির চরম চাপ দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ যদিও অভিন্ন বা আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রবাহ পেয়ে থাকে; জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট সংকটের কারণে পানি নিরাপত্তার দিক থেকে দেশটি অত্যন্ত নাজুক অঞ্চলে অবস্থান করছে। কারণ প্রধান তিনটি নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনাসহ বিপুলসংখ্যক নদীর পানিপ্রবাহের প্রায় ৮০ শতাংশই দেশের বাইরে থেকে আসে। গঙ্গা ব-দ্বীপের ভারতীয় অংশে পানি প্রত্যাহারের কারণে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কৃষি, বন, শিল্প ও মৎস্য খাতে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-নাজুক দেশটিতে আন্তঃসীমান্ত নদীর দ্বন্দ্ব জটিলতায় অতিরিক্ত মাত্রা যুক্ত করছে।
বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার এসব ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় অনেক গবেষণায় নদনদীর পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণে জোর দেওয়া হলেও অধিকাংশই মূলত গঙ্গা ও এর প্রধান শাখাগুলোতে আলোকপাত করা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো অন্যান্য প্রধান নদীর প্রতি সামান্যই মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহের মৌসুমভিত্তিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ সমীক্ষাই বার্ষিক ও মাসিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করেছে।
বাংলাদেশে ষাটের দশক থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নদী প্রবাহের ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি (দশকভিত্তিক, মৌসুমভিত্তিক, বার্ষিক ও স্থানিক) বিশ্লেষণ এবং দেশজুড়ে পানি ব্যবস্থাপনার জন্য নিরাপদ প্রবাহ পরিসর (এসওএস) নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালানো হয়নি। এসওএস ধারণাটি মিঠাপানির ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যসহ ৯টি প্রধান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সীমা নির্ধারণ করেছে। এ সীমা অতিক্রম করতে না দিলে সামাজিক ও প্রতিবেশগত ব্যবস্থায় বিপজ্জনক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।
ধারণাটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা পরিকল্পনায়ও সহায়তা করে থাকে। কারণ পানিসম্পদ এসডিজির সকল লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। পানির জন্য নির্ধারিত এসওএস লঙ্ঘিত হলে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থার মৌলিক প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতা ব্যাহত এবং টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জ্ঞানজগতের এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে এ গবেষণায় বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ প্রবাহ পরিসর ধারণা ব্যবহারের মাধ্যমে নদীপ্রবাহের ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি (স্থানিক ও কালিক) এবং এর নীতিগত প্রভাব বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত গবেষণা-প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে:
১. কোন কোন নদীর প্রবাহ কমছে বা বাড়ছে?
২. এই প্রবণতার পেছনে আপাত চালক কী?
৩. গত কয়েক দশকে মনুষ্যসৃষ্ট কারণ কীভাবে নদীর প্রবাহ পরিবর্তন করেছে?
৪. পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এসওএসের সীমারেখা কী কী?
৫. পানিসম্পদের জন্য নির্ধারিত এসওএস পরিচালনায় নীতিগত তাৎপর্য কী কী?
৩. কারিগরি বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রবাহ সংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এ গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রথমত, গত তিন দশকে (১৯৯০-২০১৮) অধিকাংশ নদীর বর্ষা-পূর্ব, বর্ষা ঋতু ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে নদীর প্রবাহ কমে গেছে, কেবল আত্রাই (বর্ষাকাল), সুরমা-মেঘনা ও তিস্তা নদী ছাড়া। তবে নব্বই দশকের আগে সব নদীতেই প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছিল; ব্যতিক্রম ছিল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, সুরমা-মেঘনা ও গড়াই নদী, যেখানে সত্তরের দশক থেকেই নদীর প্রবাহ কমার প্রবণতা ছিল।
দ্বিতীয়ত, শীতকালে নদীর প্রবাহ ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে যমুনা, তিস্তা, কুশিয়ারা, ইছামতী ও হালদা নদীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে। এসব নদীর শীতকালীন প্রবাহ ১৯৯০ সালের আগে থেকেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
তৃতীয়ত, ৩২টি সূচকের আলোকে নদীগুলোর সামগ্রিক পানি প্রবাহ পরিবর্তনের মাত্রা উচ্চ (৬১%-৮০%) থেকে গুরুতর (৮১%-১০০%) পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে; যমুনা, তিস্তা ও সুরমা নদী ছাড়া। এই তিনটি নদীতে নদীর প্রবাহে মাঝারি মাত্রার (৪১%-৬০%) পরিবর্তন দেখা গেছে। যদিও অন্য একটি সূচকে উচ্চ (৬১%-৮০%) থেকে গুরুতর (৮১%-১০০%) পর্যায়ের পরিবর্তন দেখা গেছে।
৪. গবেষণা ফলাফল
গবেষণাটি নিরাপদ প্রবাহ পরিসর ধারণা ব্যবহার করে ১০টি প্রধান নদনদী প্রবাহের ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি (স্থানিক ও কালিক) এবং এর নীতিগত প্রভাব বিশ্লেষণের প্রথম প্রচেষ্টা। গবেষণালব্ধ ফল বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিজ্ঞান ও নীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রথমত, আমাদের নদীর পানি প্রবাহের ধারা, পরিবর্তন পয়েন্ট এবং হাইড্রোলজিক্যাল পরিবর্তন বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে, জলাধার নির্মাণ, বাঁধ স্থাপনসহ মানুষের কর্মকাণ্ড প্রধান নদীগুলোর প্রবাহে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর ওপর বিরূপ প্রভাবের মাত্রার তারতম্যের কারণে নদীগুলোর প্রবাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মাত্রা বিভিন্ন ছিল। যেমন ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর উজানে চীনের জলবিদ্যুৎ বাঁধ ও অন্যান্য জল-অবকাঠামো, বাংলাদেশের জল-অবকাঠামো, গঙ্গা ও গড়াই নদীর উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ, সেচের জন্য হালদা নদীর বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো, তিস্তা নদীতে ভারত ও বাংলাদেশের ব্যারাজ, ইছামতী নদীর ভারতীয় অংশে পানির অতি ব্যবহার এবং সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদীর উজানে সেচ বাঁধ নদীগুলোর উচ্চমাত্রার প্রবাহ পরিবর্তনের জন্য দায়ী।
যদিও খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (এসডিজি ৮) অর্জনের জন্য বৃহৎ পরিসরের পানি-সম্পর্কিত অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এটি অনিচ্ছাকৃতভাবে অসমতা হ্রাস (এসডিজি ১০) এবং পানি সম্পর্কিত প্রতিবেশ ব্যবস্থা সুরক্ষা (এসডিজি ১৫) অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এসবের ফলে প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং নদীর উজান থেকে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের কারণে পানি প্রবাহ হ্রাস পায়।
দ্বিতীয়ত, হাইড্রোলজিক্যাল পরিবর্তন জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসবের অন্যান্য প্রভাবও আছে। যেমন মাছের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য হ্রাস; ইতোমধ্যে গঙ্গা নদীর নিম্নাঞ্চল ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে তা দৃশ্যমান। গঙ্গা অববাহিকার ওপরের অংশে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জাতীয় মাছ ইলিশসহ অনেক মাছের প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তা ছাড়া পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক রুই-কাতলা প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর পরিবেশ সংকটাপন্ন; বিশেষত শুকনো মৌসুমে মাছের আবাসস্থল ও প্রজনন হুমকির মুখে। পাশাপাশি হাইড্রোলজিক্যাল পরিবর্তন এবং নদী প্রবাহের হ্রাসমান প্রবণতা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থায় সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে। যদিও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে, তবুও লবণাক্ততা ও মিঠাপানির ভারসাম্য বজায় রাখতে নদীর প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উজান থেকে ভাটির দিকে নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে ইতোমধ্যে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, কৃষি এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় ও অন্যান্য অঞ্চলের সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অধিকন্তু নদীর উজানে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের ফলে গড়াই নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মৎস্য, কৃষি উৎপাদন এবং গাঙ্গেয় ডলফিনের সংখ্যায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীতে পলি পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, অভিবাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে।
মানুষের এই অপরিণামদর্শী আচরণের কারণে নদীতে কম প্রবাহের সূচকগুলো (সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে) তুলনামূলক উচ্চ প্রবাহের প্যারামিটারগুলোর (সাধারণত বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে) তুলনায় বেশি প্রভাবিত হয়েছে। উজানের অংশে পানির নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে। যার ফলে গঙ্গা, হালদাসহ অনেক নদীতে কম প্রবাহের সময় দীর্ঘতর হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে পানি প্রত্যাহারের ফলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। তা ছাড়া নদীতে কম প্রবাহের কারণে দূষণের প্রভাব বেড়ে যায়। সুতরাং, জলবায়ু-সহিষ্ণুতা বাড়াতে হলে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা জরুরি, যা বাংলাদেশের সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীর প্রবাহে হাইড্রোলজিক পরিবর্তন ও কম প্রবাহজনিত প্রভাব নির্ধারণ এই সমীক্ষার আওতার বাইরে। তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, নদীর প্রবাহে এই পরিবর্তন ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মতো জাতীয় ও বৈশ্বিক নীতিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তৃতীয়ত, গঙ্গা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ ১০টি নদীর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে নিরাপদ প্রবাহ পরিসর অতিক্রম করেছে। ছয়টি নদীর সতর্ক অবস্থান এবং চারটি নদীর বিপজ্জনক অবস্থান বিবেচনায়, এই গবেষণায় নদীর প্রবাহকে নিরাপদ পরিসরের মধ্যে রাখার জন্য ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তি, পরিবেশগত পুনরুদ্ধার এবং প্রযুক্তিগত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে প্রস্তাব ও যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, যা বাংলাদেশের সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে।
আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহ হ্রাসের প্রবণতা ঠেকানোর জন্য যেসব সফল উদাহরণ আছে, যেমন মেকং রিভার কমিশন এবং সিন্ধু পানি চুক্তি অনুসরণ করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চুক্তি করা যেতে পারে। একই চুক্তি করা যেতে পারে গঙ্গা নদীর জন্য নেপাল ও যমুনা নদীর জন্য চীন এবং ভুটানের সঙ্গে। এই গবেষণার বিশ্লেষণ থেকেও বোঝা যায়, ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের পরও গঙ্গা নদীর নিরাপদ প্রবাহ পরিসর বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির বিরোধ সমাধানে আলোচনার পাশাপাশি পরিবেশ সমস্যার সমাধান, যেমন বন উজাড়করণ নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবহারের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং জলাভূমি ও খাল পুনরুদ্ধার; যাতে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নদী ও অন্যান্য জলাশয়ের মধ্যে সংযোগ সাধন করা যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বন্যা-সহনশীলতা ও পানির নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও এই গবেষণা বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীর প্রবাহ নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে, তারপরও এটি নিরাপদ প্রবাহ পরিসর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল সর্বনিম্ন পানি প্রবাহ মূল্যায়নেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভবিষ্যৎ সমীক্ষায় বন্যা বিবেচনায় সর্বোচ্চ নদী প্রবাহ, এসওএস অতিক্রমের ফলে পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ পানি সংকটের সম্ভাব্য দৃশ্যপটও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
সুতরাং, গবেষণাটি গুরুত্ব দিচ্ছে, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা (এসডিজি ৬) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নদীর নিরাপদ প্রবাহ পরিসর নিশ্চিত করা জরুরি।
৫. নীতিগত করণীয়
ক. ১০টি নদীর মধ্যে চারটি– গঙ্গা (শুষ্ক মৌসুমে), গড়াই, হালদা এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র পানি নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে এবং অন্য ছয়টি নদী ‘সতর্কতামূলক’ অবস্থানে রয়েছে।
খ. গত তিন দশকে শীতকাল ছাড়া সকল মৌসুমি নদীর প্রবাহ হ্রাসের প্রবণতা দেখা গেছে এবং বাংলাদেশের বেশির ভাগ নদীর প্রবাহ পরিবর্তিত (উচ্চ থেকে তীব্র) ।
গ. নদী প্রবাহের হ্রাসমান প্রবণতা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ঘ. ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি একটি কূটনৈতিক অগ্রগতি হলেও গবেষণায় এর জটিল বাস্তবতা স্পষ্ট। যদিও ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গঙ্গার প্রবাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ভারতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগের (১৯৭৬ সালের পূর্ববর্তী) স্তরের তুলনায় যথেষ্ট কম ছিল।
ঙ. যদিও প্রধান নদীগুলোর বিপজ্জনক অবস্থা বাংলাদেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, তবুও নদীর পানি সংকটের আন্তঃসীমান্ত প্রভাব রয়েছে।
চ. আন্তঃসীমান্ত নদীর বিরোধ সমাধানের জন্য আলোচনা, চুক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি পরিবেশগত পুনরুদ্ধার যেমন বন উজাড় হ্রাস, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন পরিচালনা এবং জলাভূমি ও খাল পুনরুদ্ধার বাংলাদেশে বন্যা প্রতিরোধ এবং পানিসম্পদ সুরক্ষা বাড়াতে পারে।
ছ. রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই পানিবণ্টন এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে স্থিতিশীল রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে জরুরিভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে জাতীয় বা আন্তঃসীমান্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সত্ত্বেও এই লক্ষ্যগুলো ধারাবাহিক থাকে। আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার সকল দেশের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি ও সহযোগিতামূলক সমাধান করতে হবে, যাতে কোনো দেশ বাদ না পড়ে। বাংলাদেশের উচিত বাদ পড়া আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোকে আবার আলোচনায় আনা।
জ. ভবিষ্যতের আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন চুক্তিগুলো ঐতিহাসিক নদীর প্রবাহের ্রও ভিত্তি করে হতে হবে, বিদ্যমান অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে।
ঝ. ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব এবং ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চীনের নতুন বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা, পানিসম্পদকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আরও তীব্র সংকট তৈরি করতে পারে।
ঞ. নদী অববাহিকা ভাগাভাগিকারী দেশগুলোর মধ্যে পানি বণ্টনের জন্য করভিত্তিক পানি বণ্টন গ্রহণ একটি অভিনব পদ্ধতি হতে পারে। বেশি পানি ব্যবহারকারী দেশগুলোকে আরও বেশি কর দিতে হবে এবং চুক্তিতে নদী ভাগাভাগিকারী অন্যান্য দেশের মধ্যে রাজস্ব পুনর্বণ্টন করা হবে।
গবেষণাটির উপকরণ, পদ্ধতি, ফলাফল, রেফারেন্স তালিকাসহ নিবন্ধটির মূল সংস্করণ পাওয়া যাবে এই ওয়েবসাইটে: A safe operating space for the major rivers in the Bangladesh Delta.
Environmental Research Letters. doi: https://doi.org/10.1088/1748-9326/ad796d.
আলমগীর কবীর: পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, ঢাকা; শেখ রোকন: মহাসচিব, রিভারাইন পিপল, ঢাকা, বাংলাদেশ; মো. মাহমুদুল হাসান ও হাসান মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ: এগ্রোফরেস্ট্রি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ; ড. মো. সারওয়ার হোসেন: স্কুল অব সোশ্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল
সাসটেইনেবিলিটি, ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো,
ডামফ্রিজ, যুক্তরাজ্য
- বিষয় :
- নদী