অন্যদৃষ্টি
সাপ-কুমির নাগরিক চিনবে?
বাংলাদেশ সীমান্তের নদীপথ ও জলাভূমিতে বিষাক্ত প্রাণী ছাড়ার পরিকল্পনা করছে ভারত!
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২৬ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:২৫
বাংলাদেশ সীমান্তের নদীপথ ও জলাভূমিতে বিষাক্ত প্রাণী ছাড়ার পরিকল্পনা করছে ভারত! দেশটির সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে সমকালে প্রকাশিত খবর বলছে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সাপ ও কুমিরের মতো প্রাণী ছাড়তে চাচ্ছে সীমান্ত সুরক্ষার অংশ হিসেবেই! বাংলাদেশ সীমান্তে এই বৃহৎ প্রতিবেশীর যে আগ্রাসী আচরণ আমরা দেখে আসছি, তাতে এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে আছে ভারত; দীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটারের সীমান্ত। বিশ্বের শীর্ষ মারাত্মক সীমান্তের (ডেডলিয়েস্ট বর্ডার) তালিকায় প্রথম দিকেই থাকে এই সীমান্ত। বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশির মৃত্যু প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের খবর হয়। ২০১১ সালে সীমান্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ফেলানীকে। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরীটির লাশ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। গত বছর বিএসএফের গুলিতে ৩২ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছে। সীমান্তের অধিকাংশ স্থানে বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়া আছে। এর বাইরে যেসব স্থানে নদী বা জলাশয় রয়েছে, এবার সেখানে বিষাক্ত সাপ, কুমিরের মতো সরীসৃপ প্রাণী ছাড়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করছে তারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেল অ্যাসোসিয়েট এডিটর সমির কে. পুরকায়স্থ তাঁর প্রতিবেদনে শিরোনাম দিয়েছেন, ওয়াইল্ড ইস্ট? বিএসএফ মে ইউজ স্নেকস, ক্রোকোডাইলস, টু গার্ড পোরাস বাংলাদেশ বর্ডার। সোজা কথা বললে, অরক্ষিত বাংলাদেশ সীমান্ত পাহারা দিতে বিএসএফ সাপ ও কুমির ব্যবহার করতে পারে। তিনি লিখেছেন, অতীতে রাজা-বাদশাহদের প্রাসাদ ও দুর্গের চারপাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কুমিরভর্তি পরিখা ব্যবহারের কাহিনি শোনা যেত। একুশ শতকে এসে ভারত তার নিরাপত্তায় সে ধারণা বাস্তবে নিয়ে আসছে। যেখানে বিএসএফ মোতায়েন করা যাচ্ছে না এবং নদী কিংবা জলাভূমি আছে, সেসব ফাঁকা জায়গায় এসব বিষাক্ত প্রাণী সীমান্তে সুরক্ষা দেবে!
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে নজরদারি ড্রোন, জিপিএস-সমর্থিত ট্র্যাকিং ও লোকেটিং গ্যাজেট এবং থার্মাল ইমেজারের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ভারত। এখন শেষ চিকিৎসা হিসেবে বিষাক্ত প্রাণী ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না দেশটি। সাপ ও কুমিরের মতো প্রাণীকে মানুষ ভয় পায়। যাদের বিষাক্ত কামড়ে মানুষকে মৃত্যুর দরজায় নিয়ে যায়, এমন প্রাণী দিয়ে প্রতিবেশীকে কামড়ানোর ব্যবস্থা কি অন্য প্রতিবেশী করতে পারে?
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত নভেম্বরে বিএসএফকে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও কারিগরি দিক থেকে এগিয়ে থাকা সীমান্ত বাহিনী গড়তে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। তার পরই আমরা দেখছি, কুমির-সাপ ব্যবহারের চিন্তা করছে তারা। চিন্তা হিসেবে এটি অভিনব হতে পারে; কিন্তু এর মধ্যে প্রতিবেশীর প্রতি মনোভাবও স্পষ্ট।
প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখার গুরুত্ব কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু সম্পর্কের নামে নতজানু নীতি কেউই চাইবে না। দুটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আস্থা, সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশেরই সে আন্তরিকতা থাকা দরকার। ভারত যদি তার সীমান্ত সুরক্ষায় বিষাক্ত প্রাণী ছাড়ার চিন্তা করা বাংলাদেশের জন্য কেবল উদ্বেগের নয়; অপমানজনকও। দেশটির উচিত এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে দুইবার চিন্তা করা। সীমান্ত সুরক্ষার জন্য বিএসএফের পেশাদারিত্বই যথেষ্ট, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন মেনে কূটনৈতিক শিষ্টতা বজায় রাখার মধ্যেই দুই দেশের সীমান্তে শান্তি আসতে পারে।
এই প্রশ্নও জাগে, সাপ-কুমির কি নাগরিকত্ব দেখে কামড় দেবে? বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ সীমান্তই কেবল নয়, জীবন ও জনঘনিষ্ঠও। সীমান্তে ভারতীয় জনগোষ্ঠীও কম নয়; সাপ-কুমির যে তাদের কামড়াবে না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com
- বিষয় :
- সীমান্ত
- ভারত সীমান্ত