বিশ্ব শান্তি দিবস
থামতে জানাই শান্তির পূর্বশর্ত
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৩
আজ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। ১৯৮১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ দিবসটি চালু করে বিশ্বব্যাপী অহিংসা, যুদ্ধবিরতি, সর্বোপরি শান্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে। দিনটি সামনে রেখে প্রাত্যহিক জীবনাচরণ থেকে ভূ-রাজনীতির ময়দান পর্যন্ত শান্তির পথে মূল প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা সময়ের দাবি।
সম্প্রতি শ্রেণিকক্ষে ‘উগ্রবাদভিত্তিক’ সংঘাত ও শান্তিহীনতার বিস্তার নিয়ে আলোচনা করছিলাম; কীভাবে ‘পরিচয়ভিত্তিক’ অহংবোধ ও শ্রেষ্ঠত্ব থেকে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় চরিত্রের ‘থামতে না জানা’ তথা উগ্রবাদের জন্ম দেয়। উগ্রবাদের সঙ্গে শান্তির সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। থামতে না জানার এই মানসিকতায় জোর দিয়েই ইউনেস্কো সনদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে– যুদ্ধের সূচনা মূলত মানুষের মস্তিষ্কেই ঘটে। যদিও মনোবিজ্ঞানীরা গুরুত্ব দেন ইগোর ওপর। ইগো ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ থেকে ইরানের কাছে পরাজয় মেনে নিতে না পেরে সম্প্রতি মহাকাশে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র!
আমাদের মধ্যে উগ্রবাদ নিয়ে একটা সংকীর্ণ ধারণা প্রচলিত। ‘উগ্রবাদ’ বলতে কেবল ধর্মভিত্তিক, বিশেষত ইসলামী উগ্রতাকেই বোঝায়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে রয়েছে সামষ্টিক বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা, জ্ঞানের উপনিবেশায়ন মোকাবিলায় ব্যর্থতা। প্রকৃতপক্ষে উগ্রতা বহুমাত্রিক। যখন কোনো ব্যক্তি তার সামাজিক পদমর্যাদা, গোষ্ঠীগত পরিচয় কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে অন্যকে তাচ্ছিল্য করে, তখনই উগ্রতার বীজ মস্তিষ্কে রোপিত হয। এভাবেই শুরু হয় শোষণ ও নিপীড়নের ক্ষেত্র। ব্যক্তিগত এই মনস্তাত্ত্বিক উগ্রতা কালক্রমে সামষ্টিক উগ্রতায় রূপ নেয়। একটি গোষ্ঠী বা দলের কতিপয় নেতার অসংযত ও উগ্র আচরণের মাশুল পুরো গোষ্ঠীকেই দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এভাবেই পুরো সামাজিক কাঠামো উগ্রবাদী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
সম্প্রতি ডাকসু সংগ্রহশালায় ভারত ভাগের অন্যতম প্রধান নেতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি টানানোকে কেন্দ্র করে তৈরি বিতর্ক ও উত্তেজনা ‘থামতে না জানা’র বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার চার দিন আগে ইতিহাসচর্চা কিংবা স্মৃতি সংরক্ষণের নামে সংবেদনশীল প্রতীককে সামনে নিয়ে আসে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ও স্পর্শকাতর অধ্যায়কে অহেতুক উস্কে দিয়ে স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দলগত ও আদর্শিক উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
‘অমুক নেতা না জন্মালে দেশ স্বাধীন হতো না’– এ ধরনের অতিসরলীকরণ সমাজে গোষ্ঠীগত শ্রেষ্ঠত্বের অপসংস্কৃতি তৈরি করে। ফলে ধর্মতাত্ত্বিক গোঁড়ামির পাশাপাশি নতুন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্ধবিশ্বাসের জন্ম হয়। আমাদের বুঝতে হবে, প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি থাকে। সেই প্রেক্ষাপট ও জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হলে রাষ্ট্র আজ কিংবা কাল অর্জিত হবেই।
রাজনৈতিক দলকে বুঝতে হবে, তার ক্ষমতার সীমানা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের উপায় কী। থামার জায়গাটা চিনতে না পারলে অনিবার্যভাবে জন্ম নেয় দলগত উগ্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অহংবোধ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবণতাও দলগত উগ্রতার প্রমাণ। ফলে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেনি। এ ধরনের উগ্রতা রোধে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান ও ঐতিহাসিক সচেতনতার সামাজিকীকরণ জরুরি।
বাংলাদেশ কেবল নয়; সীমান্তবর্তী ভারত ও মিয়ানমারের দিকে তাকালেও এই উগ্রতার বৃহত্তর সংক্রামক রূপটি স্পষ্ট। প্রতিটি দেশেই ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক ধর্মীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ’ সামাজিক সংহতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে প্রধান বাধা হিসেবে আবির্ভূত।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী কট্টর ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনীতির উত্থান সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ। গরুর মাংস ব্যবস্থাপনা, খাদ্যাভ্যাস কিংবা পোশাককে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে অপদস্থ করার ঘটনা সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। অনেক সময় প্রাণ সংশয়ও ঘটছে।
বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘৃণ্য খবর মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর মতো তুচ্ছ অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে, পুড়িয়ে মারার নির্মমতা দেখা গেছে। ক্ষোভ প্রকাশের নামে ‘থামতে না জানা’র এই সংক্রামক ব্যাধি মূলত আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর নামান্তর।
মিয়ানমারে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী উগ্রতা আরও বীভৎস রূপ নিয়েছে। দেশটি উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৮২ সালে একটি মানবতাবিরোধী ও বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইন করে। ফলে শতাব্দী ধরে সহাবস্থানকারী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে রাতারাতি রাষ্ট্রহীন করে ফেলে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো জাতিগত নিধন ও নিপীড়নকে তারা নিজেদের ‘ধর্ম ও অস্তিত্ব রক্ষার উপায়’ হিসেবে বয়ান দাঁড় করাচ্ছে।

অথচ ‘জাতিরাষ্ট্র’ গঠনের মূল দার্শনিক ভিত্তি ছিল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভেতরে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যখন এসব উগ্র আচরণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক, নিরপেক্ষ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, প্রকারান্তরে এই রাষ্ট্র নিজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী উগ্র রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়। ফলে আজ খোদ ‘জাতিরাষ্ট্র’ নামক সামাজিক চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ও সার্থকতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী গভীর প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সর্বব্যাপী শান্তির সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? এ ক্ষেত্রে ইউরোপের রক্তাক্ত ইতিহাস বিশেষ শিক্ষা দেয়। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাত, সাম্রাজ্যের বিস্তার ও ধর্মীয় উগ্রতা পেছনে ফেলে ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাতিসংঘ, সর্বশেষ শীতল যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ইউরোপ অনুধাবন করে– ‘থামতে না জানা’ সব পক্ষের ধ্বংস ডেকে আনে। দেশগুলো প্রতিহিংসাকে অর্থনৈতিক সংহতি, মানবাধিকার ও সহযোগিতায় রূপান্তর করে বৃহত্তর ইউরোপিয়ান জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সীমানা উন্মুক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সফল আঞ্চলিকতাবাদের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
শান্তি অধ্যয়নের জনক ইউহান গালতুং কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতিভিত্তিক শান্তির ধারণাকে ‘নেতিবাচক শান্তি’ এবং অর্থনৈতিক মুক্তি, কাঠামোগত বৈষম্যহীনতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে অর্জিত স্থিতিশীল অবস্থাকে ‘ইতিবাচক শান্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। শান্তির এই ভাবনা আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে সব রাষ্ট্রের মূলনীতি হওয়া উচিত। ইউরোপ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও কাঠামোগত সমতার মাধ্যমে এই ইতিবাচক শান্তি নিশ্চিত করায় শান্তিসহ প্রায় সব ইতিবাচক সূচকেই শীর্ষে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কাঙ্ক্ষিত শান্তি অর্জনের জন্য ধর্ম, জাতি ও ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধে আইনি ও সামাজিক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পরিচয়ভিত্তিক নয়, বরং সমান সুযোগের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরমতসহিষ্ণু নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত অহংবোধ ও রাষ্ট্রীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ রুখতে ‘থামতে শেখা’র সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন প্রয়োজন। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ‘শান্তি শিক্ষা’ ও বহুত্ববাদী চিন্তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রয়োজন। তবে এই সংকট নিরসনে সংখ্যালঘুদের ভূমিকাও জরুরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যখন একপক্ষীয় দলীয়করণ বা উগ্র ভাবাদর্শে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের নাগরিক সুরক্ষাও ঝুঁকিতে পড়ে। বস্তুত অন্ধ দলীয় আনুগত্য সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নির্বিশেষে নাগরিক বিবেচনা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। প্রতিষেধক হিসেবে প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য বুদ্ধিমত্তা, সংযম ও নিরপেক্ষ পথ অনুসরণ করা এ ক্ষেত্রে কার্যকরী হতে পারে।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
sazzadhsiddiqui@du.ac.bd
- বিষয় :
- দিবস