ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৃতীয় মেরু

ত্রিদেশীয় নয় মি. থারুর, পঞ্চদেশীয় ব্যবস্থা

ত্রিদেশীয় নয় মি. থারুর, পঞ্চদেশীয় ব্যবস্থা
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৫ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:২৯

প্রভাবশালী ভারতীয় লেখক, কূটনীতিক ও রাজনীতিক শশী থারুর নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় নিয়ে সেপ্টেম্বরের গোড়ায় প্রকাশিত তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছেন– ‘হিমালয় অঞ্চলের উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ঐতিহাসিকভাবেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ, প্রতিক্রিয়ামূলক এবং জাতীয় নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তায় সীমাবদ্ধ। ... দুর্যোগকালীন গুরুতর প্রয়োজনের মুহূর্তে ভাটির দেশগুলোকে অন্ধকারে রাখা হয়’ (থারুর থিঙ্ক, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

শশী থারুরের কলামটির শিরোনাম ‘মাউন্টেইনস বাইন্ডস ইন্ডিয়া, চায়না, অ্যান্ড নেপাল টু আ শেয়ারড ডেসটিনি, দে নিড টু অনার ইট’। বাংলায় বললে– পর্বতমালা ভারত, চীন ও নেপালকে অভিন্ন নিয়তিতে বেঁধে রেখেছে; তাদের উচিত এ বন্ধনকে সম্মান করা।

বাস্তবে কেবল পর্বতমালা নয়; এ অঞ্চলের দেশগুলোকে বেঁধে রেখেছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনার মতো নদীও। এ ছাড়া ঢল, লেক বিস্ফোরণ, মেঘ বিস্ফোরণ, ভূমিধস, হিমবাহধসের মতো দুর্যোগও নদীপথে নেমে আসে ভাটির দিকে। শুধু তাই নয়, এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের প্রধান সূত্র কিন্তু নদী। যেমন ভারত ও চীনের মধ্যে যদিও সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, সেটা অনুবাদ হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রে চীনা ও ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে। এমনকি দুই দেশের সীমান্তরেখার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকলেও চীনা ও ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জের পোহাতে হবে বাংলাদেশকেও।

এমনকি, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে মাঝেমধ্যেই ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ ধূমায়িত হয়ে ওঠে; নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এর নেপথ্যে রয়েছে অভিন্ন নদীগুলোতে ভাটির দেশের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন।

দুই.

ভারতীয় রাজনীতি ও কূটনীতিতে শশী থারুরের অভিজ্ঞতা ও অবস্থানের গুরুত্ব বিবেচনায় এ বক্তব্যকে ‘বাঁক বদলের মুহূর্ত’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। প্রথম কারণ হচ্ছে, ভারত নিজেকে ‘ভাটির দেশ’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে– এমন মুহূর্ত বিরলই বটে। পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু নদীধারা কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীধারার প্রসঙ্গ যখন আসে, তখন ভারতের দিক থেকে সাধারণত আলোচনা শুরুই হয় ‘উজানের দেশ’ হিসেবে পরিচিতি দিয়ে। এমনকি ভাটির এই দুই দেশের সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক অন্যান্য ইস্যুতেও অভিন্ন নদীর উজানে অবস্থানের সুবিধা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রয়োগে কসুর করতে দেখা যায় না। 

এমনকি নেপাল ও ভুটান ভৌগোলিকভাবে ‘উজানের দেশ’ হলেও ভারত নিজেকে ‘ভাটির দেশ’ মনে করেছে– এমন নজির বিরল। যেমন নেপালের সঙ্গে ভারতের তিনটি নদী বিষয়ক চুক্তি রয়েছে– কোশি চুক্তি ১৯৫৪, গণ্ডক চুক্তি ১৯৫৯, মহাকালী চুক্তি ১৯৯৬। এগুলো নিয়ে বরং উজানের দেশ নেপালেরই অসন্তোষ রয়েছে। নদী চুক্তির ক্ষেত্রে ভাটির দেশের বদলে উজানের দেশ অসন্তুষ্ট, এমন নজির বিশ্বে বেশি নেই। ভারত ও ভুটানের অভিন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে কাজ করে যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি। এটা ঠিক, নেপালের মতো ভুটানের অসন্তোষ নেই। কিন্তু সেখানে গৃহীত নানা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভাটির দেশেরই প্রাধান্য স্পষ্ট।

দ্বিতীয় যে কারণে শশী থারুরের কলামটি বাঁক বদলকারী বিবেচিত হতে পারে, সেটি হচ্ছে বহুপাক্ষিকতার আহ্বান। তিনি লিখেছেন, ‘এবারের দুর্যোগটি ভারত, নেপাল ও চীনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জরুরি প্রয়োজনীয়তা প্রদর্শন করেছে; একান্তভাবেই প্রতিবেশগত সুরক্ষা, পানি ও প্রবাহ সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক উপাত্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর যৌথ উদ্যোগ নিয়ে।’

দক্ষিণ এশিয়ার পানি-কূটনীতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ভারত বরাবরই দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা বা ব্যবস্থাপনার পক্ষে। যে কারণে অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশের পৃথক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা থাকলেও কোনো ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা নেই। এমনকি নেপাল, ভারত ও ভুটান একই গঙ্গা অববাহিকার অংশ হলেও নয়াদিল্লি কাঠমান্ডু ও ঢাকার সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে। শুধু তাই নয়; গঙ্গা চুক্তি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারংবার একই অববাহিকার নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলা হলেও প্রত্যেকবার সেটা ভারতের কাছে প্রত্যাখ্যাত। সেই ভারতের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক ও কূটনীতিক যখন ভারত, নেপাল ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থার কথা বলেন, সেটা বাঁক বদলই বটে। 

তৃতীয়ত, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদল মিলেছে শশী থারুরের কলামে। তিনি যথার্থই লিখেছেন, হিমালয় অঞ্চলে উজান ও ভাটির দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বাধা ‘জাতীয় নিরাপত্তাজনিত গোপনীয়তা’। এ ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন– ‘সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলা মহড়া এবং আন্তঃসীমান্ত পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্প দুর্যোগ মোকাবিলাকারী সামরিক ও বেসামরিক সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর আস্থা গড়ে তুলতে পারে; যে সংস্থাগুলো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরস্পরকে ভূ-রাজনৈতিক সন্দেহের চোখে দেখে থাকে।’ 

তিন.

নেপালের দুর্যোগ-পরবর্তী করণীয় নিয়ে শশী থারুরের আলোচনা ও প্রস্তাবগুলো উত্তম– সন্দেহ নেই। মুশকিল হলো, তিনি সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন কেবল ভারত, নেপাল ও চীনের মধ্যে। একই অববাহিকার চূড়ান্ত ভাটির দেশ এবং তাঁর আলোচনায় উঠে আসা উপমহাদেশের দুই প্রধান নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থল বাংলাদেশের কথা নেই। এমনকি এই অববাহিকারই অপর দেশ এবং নানা বিবেচনায় ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভুটানের কথাও উল্লেখ নেই!

বস্তুত শশী থারুরের ‘ভাটির দেশ’ ধারণা ভারতে এসেই থমকে গেছে। তিনি যে চীনের সঙ্গে ‘ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা’ চান; সেখানকার তিব্বতে উদ্ভূত তিনটি প্রধান নদীধারা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র যদিও ভারত পেরিয়ে আরও ভাটিতে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে; তাঁর ‘বহুপক্ষীয় চিন্তা’ ভারতের সীমানাতেই আটকে আছে! 

শশী থারুর তাঁর নিবন্ধে যে তিনটি সুপারিশ করেছেন, সেখানে ‘কোনো দেশ এককভাবে পরিস্থিতি যাচাইয়ের বদলে অবশ্যই যৌথভাবে প্রতিবেশগত গবেষণা এবং ঝুঁকি নিরূপণ’ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই অঞ্চলে ‘যৌথভাবে’ বলতে আসলে কী বোঝায়, সেটা সম্ভবত তাঁর নিজের কাছেই স্পষ্ট নয়। অন্যথায়, বাংলাদেশ ও ভুটানকে বাদ দিয়ে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার প্রতিবেশগত গবেষণা বা ঝুঁকি নিরূপণ কীভাবে সম্ভব? 

শশী থারুরের অভিযোগ, হিমালয়ের তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহধসজনিত ঢল কখন ভাটির দিকে নেমে আসতে পারে, এ জন্য নেপাল ও ভারতের পক্ষে চীনে প্রশাসনিক মর্জির ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। পরিহাসের বিষয়, আরও ভাটির দিকে যদি তিনি তাকাতেন, তাহলে দেখতেন বাংলাদেশকে ঠিক একই ধরনের অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। এটা ঠিক, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বন্যা, বৃষ্টিপাত ও প্রবাহের তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অভিন্ন নদীগুলোতে স্থাপিত ব্যারাজ, ড্যাম ও অন্যান্য স্থাপনার পরিচালন সংক্রান্ত কোনো তথ্য বাংলাদেশ পায় না; শশী থারুর বর্ণিত ‘জাতীয় নিরাপত্তাজনিত’ গোপনীয়তার কারণেই। ২০২৪ সালের আগস্টে এ সংক্রান্ত তথ্যহীনতার কারণেই ফেনী ও কুমিল্লা অঞ্চলে আকস্মিক ঢল প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল।  

চার.

মোট কথা, শশী থারুর প্রত্যাশা করছেন, ‘উজানের দেশ’ চীন আঞ্চলিক অভিন্ন নিয়তিকে সম্মান করে ‘ভাটির দেশ’ ভারতকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করুক। এ ক্ষেত্রে ‘উজানের দেশ’ হিসেবে ভারত অভিন্ন নিয়তিকে সম্মান না করে ‘ভাটির দেশ’ বাংলাদেশের সঙ্গে কী আচরণ করে থাকে; ভালো হতো সে প্রসঙ্গ উল্লেখ থাকলে। তাহলে চীনের প্রতি তাঁর এই আহ্বান আরও ন্যায্য ও দৃঢ় হতো।
সব মিলিয়ে শশী থারুরের কলামটির ন্যায্য শিরোনাম হতে পারত– ‘রিভারস বাইন্ডস ইন্ডিয়া, চায়না, নেপাল, ভুটান, অ্যান্ড বাংলাদেশ টু আ শেয়ারড ডেসটিনি, দে নিড টু অনার ইট’। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ ও ভুটানকে যুক্ত করে; এটা মনে রেখে যে, এই অঞ্চলের নদী ব্যবস্থা ত্রিদেশীয় নয়, অন্তত পঞ্চদেশীয়।

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
skrokon@gmail.com 

আরও পড়ুন

×