ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জ্বালানি নিরাপত্তা হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তি

জ্বালানি নিরাপত্তা হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তি
×

সাহিদ রেজা

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪০

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি সংকট আরেকটি সংকটকে গভীরতর করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা শিল্পের উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে। ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম ও কর্মসংস্থানে তার প্রভাব পড়ছে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। ফলে জ্বালানি সংকটকে কেবল শিল্প খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

একজন মানুষের আয় হয়তো আগের মতোই আছে। কিন্তু সেই আয় দিয়ে যদি প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনা কঠিন হয়ে যায়, তাহলে তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাস্তবে কমে যায়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি আলোচনায় এই সম্ভাবনা উঠে আসে। আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়লে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি হয়, যা কখনও আত্মহননের পর্যায়ে চলে যায়।

এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ শুধু বেশি গ্যাস আমদানি বা বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন প্রয়োজন এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক যাত্রা, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং সংকটের বোঝাও কোনো একটি শ্রেণির ওপর অসমভাবে চাপবে না।

তবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখা যায়। শিল্পকে জ্বালানি দিলে শুধু শিল্প বাঁচে না; এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকাও সুরক্ষিত হয়। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। ব্যবসা সম্প্রসারিত হলে সরবরাহকারী ও সেবা খাতও উপকৃত হয়। অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের একটি ‘মাল্টিপল ইফেক্ট’ রয়েছে। এ কারণেই এলএনজি আমদানির মাধ্যমে স্বল্প মেয়াদে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমদানি, রি-গ্যাসিফিকেশন, ডেলিভারি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে জ্বালানির প্রকৃত ব্যয় বাড়তে পারে এবং সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। 

এখানেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পুরো ব্যয় যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় বা মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে, তাহলে সেই সমাধান দীর্ঘ মেয়াদে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না। আবার জ্বালানির উচ্চমূল্য দেখে শিল্পে সরবরাহ কমিয়ে দিলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য– সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশে পৌঁছে দেওয়া।জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পূর্বাভাস ও পরিকল্পনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  

একটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ‘তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো’র নীতি দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না। কাউকে পেছনে না রাখা শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বাড়লেই উন্নয়ন সম্পূর্ণ হয় না। যদি শিল্প বাড়ে কিন্তু শ্রমিকের বাস্তব আয় না বাড়ে; কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকে; যদি শহরের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি পায় কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উৎপাদন চালাতে না পারেন; সার-সেচের অভাবে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অর্থ হলো– নীতির কেন্দ্রে মানুষকে রাখা। মানুষ যেন কাজ পায়, উদ্যোক্তা যেন বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পান, শিল্প যেন উৎপাদন করতে পারে, ব্যাংক যেন সুস্থভাবে ঋণ দিতে পারে এবং ভোক্তা যেন প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা যুক্তিসংগত মূল্যে পেতে পারেন– এই পুরো চক্র একসঙ্গে দেখতে হবে।

সামনে যে পথ

বাংলাদেশের সামনে এখন সমন্বিত জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন। স্বল্প মেয়াদে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মধ্য মেয়াদে রি-গ্যাসিফিকেশন, পাইপলাইন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক বোঝা কীভাবে জনগণ, শিল্প ও রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টন করা যায়, সেটিও ভাবতে হবে। 

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি, যা মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রাখবে না; মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেবে। সেই সঙ্গে উদ্যোক্তা বিনিয়োগের সাহস পাবেন; শ্রমিক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাবেন; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন।

ড. এ কে এম সাহিদ রেজা: সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই

আরও পড়ুন

×