ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফগানিস্তান ফের তালেবান দখলে?

আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তান ফের তালেবান দখলে?

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২১ | ১৭:৫৮ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২১ | ১৯:০৯

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে গেছে কিনা- স্পষ্ট নয়। কিছু সৈন্য রেখে দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছিল। আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্য থাক বা না থাক, তালেবান যোদ্ধাদের পুনর্জাগরণ ঘটছে। সৈন্য প্রত্যাহার শুরুর পর থেকেই তালেবানরা অগ্রসর হচ্ছে জেলাগুলো দখলে নিতে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন সরকার তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা তালেবানদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছেন না। ইতোমধ্যে তালেবানরা ৮০টি জেলা দখল করে নিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরকারের সঙ্গে আফগান সরকার ও তালেবানদের মধ্যে সম্পর্ক তেমন সমস্যাকীর্ণ নয়। সেটি বোঝা যায় ইমরান খানের বক্তব্যেই। দিন দুই আগে নিউইয়র্ক টাইমস ইমরান খানের একটি ইন্টারভিউ করেছে। সেখানে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- আফগানিস্তানে রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে তালেবানদের বিরোধ বাধলে তিনি কোন পক্ষ নেবেন। ইমরান বলেছেন, কারও পক্ষেই যাবেন না। তিনি সীমান্তের ৯০ শতাংশ জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ফেলেছেন, যাতে কোনো আফগান শরণার্থী ঢুকতে না পারে। তিনি আফগানদের সাতেও নেই পাঁচেও নেই। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আফগানিস্তানে যারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসবে, তাদেরই স্বীকৃতি দেবে তার সরকার। আরেক প্রতিবেশী ভারত চাইছে তালেবানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে। কেন ভারত এমনটা চাইছে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তালেবানরা ভারতের সাহায্যে আসতে পারে বা আসবে। সে কারণেই একটি ইসলামিস্ট যোদ্ধা বাহিনীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে চায় ভারত। ভারত চায় তালেবানদের ব্যবহার করে পাকিস্তান ও চীনকে কিছুটা হুমকির মুখে রাখতে।
আফগানিস্তানের মতো একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের অবৈধ সামরিক যোদ্ধাদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের সুসম্পর্ক তৈরি এবং এই দেশটিকে পাকিস্তান এবং চীনের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর চিন্তা কীভাবে এলো- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নির্মাণ করা যায় সামাজিক ও ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিত থেকে; কিংবা রাষ্ট্রনৈতিক নীতি ও আদর্শের সঙ্গে মিল দেখে। আবার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেও স্বার্থসংশ্নিষ্ট বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যায়। চলতি সপ্তাহে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর কাতারে গিয়ে দেখা করেছেন আফগান তালেবান প্রতিনিধির সঙ্গে। যোদ্ধা তালেবানদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে তাদের দিয়ে পাকিস্তানকে এবং সেই সঙ্গে চীনকেও ব্যস্ত রাখার কৌশল নিতে চায় ভারত। ধারণা করা হয়, এই চিন্তা পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের মাথা থেকে নির্গত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ভারতীয় চিন্তা নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত ইসরায়েলেরও স্বার্থ জড়িত।
ভারত যদি তালেবানদের পাশে পায়, তাহলে প্রতিবেশী পাকিস্তানের রাজনৈতিক চেহারা কেমন হতে পারে? এ প্রশ্ন মনে জাগলেও সাধারণত কেউ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেন না। ভারতের বৈরী পাকিস্তান ও চীন। লাদাখ সীমান্তে চীনের হাতে মার খেয়েছে ভারত। সেখান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কথা চীনের। কিন্তু আজও তারা সৈন্য সরিয়ে নেয়নি। এদিকে ভারতের সেনাপ্রধান দাবি করেছেন, চীনা সৈন্যরা পাহাড়-পর্বতের জন্য ট্রেনিং পায় না। তারা সমতলেই থাকে। প্রয়োজনে পাহাড়ে আসে। তারা ভারতীয় সৈন্যদের চেয়ে গুণগত বিচারে শক্তিশালী নয়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই দেখছি আমরা। লাদাখে যে যুদ্ধ হয়েছে, সেখানে ভারতের সৈনিকদের জীবন গেছে অনেক। অন্যদিকে চীনাদের মাত্র তিনজন সৈনিক হত। হতাহতের এই ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, যুদ্ধের দক্ষতায় কারা বেশি উন্নত।
এদিকে কাশ্মীর প্রশ্নে (জো বাইডেনের উদ্দেশে) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান চান তিনি এবং তার দেশ। কাশ্মীরের জনগণ চায় তাদের দেশ স্বাধীনতা পাক। জাতিসংঘ গণভোট করে সেই ফলের ভিত্তিতে কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক সমাধান নেওয়া হোক। কিন্তু সেটা হতে দেওয়া হয়নি। এ সমস্যার সমাধান হলে উপমহাদেশে শান্তি কায়েম হবে। রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য। আর কে না জানে, বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যই হচ্ছে অস্ত্র কেনাবেচা! কোন দেশ কোন দেশের অস্ত্র কিনল, তা নিয়েও বিরোধ আছে। সম্প্রতি তুরস্ক রাশিয়ার অস্ত্র কেনায় ভীষণভাবে নাখোশ যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে।
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি অস্ত্র বাণিজ্যই এখনকার বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য। পৃথিবীর সব ধরনের সম্পদ নিজেদের দখলে নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা আজকের রাশিয়া। এখন শনৈ শনৈ সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে উঠছে চীন। চীনের এই উত্থান রুখতেই যুক্তরাষ্ট্র হাত মিলিয়েছে ভারতের সঙ্গে। 'কোয়াড' রচনা করে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ছোটো আকারের জোট গড়ে তুলতে চাইছে। সেই জোটে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ সে জোটে যোগ দেবে কি দেবে না, সেটা এখনও জানা যায়নি বটে, তবে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের আবদার নাও ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যে শুধু ক্রিকেটের ক্যাপ্টেনসি করেননি, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন; বোঝা গেল তার অতি সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে। কাশ্মীর প্রশ্নে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করে দেয়, তাহলে তো পরমাণু বোমার প্রয়োজনই পড়ে না। পাকিস্তানের চোখে কেবল ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যু। একবারও চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চীন নিয়ে কোনো কথা নেই। স্বাধীন কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ দেশ হিসেবে চিন্তা করলে ভারত, পাকিস্তানই কেবল জড়িত হবে না' পাকিস্তানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে চীনও। আর তেমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বসে না থেকে ভারতের পাশে এসে দাঁড়াবে। পৃথিবীর সাধারণ মানুষ কোনো যুদ্ধ চায় না। ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে মানুষ খুবই ক্লান্ত। তাই যার যার জন্মভূমি নিজস্ব টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারিতে মুক্ত-স্বাধীন হোক- এটাই তাদের কাম্য।

সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×