জনমুখী গৃহায়ন খাত সম্ভব
মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা হচ্ছে আবাসন। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির একটি প্রধান খাত হচ্ছে আবাসন খাত, যা স্বাধীনতাপরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। যেখানে অবকাঠামো, শিল্প ও যোগাযোগ খাত অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে, সেখানে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক অবদান রাখতে পারা আবাসন খাত আরও বৃহৎ পরিসরে এবং উদ্ভাবনমুখী ফোকাসের দাবিদার। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধাপগুলো নির্ভর করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর। গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় একটি দ্রুত বর্ধিত খাত হিসেবে গৃহায়ন খাত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, জিডিপিতে গৃহায়ন খাতের অবদান ৭.৪ শতাংশ। তা সত্ত্বেও গৃহায়ন খাত বর্তমানে অনেকটাই অবহেলিত।
প্রায় প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য এবং প্রধান চাহিদা নিজের একটি বাড়ি। এই চাহিদা পূরণে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গৃহনির্মাণ, গৃহঋণ প্রদান ও প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দের ব্যবস্থা করে আসছে। গৃহনির্মাণে সরাসরি জড়িত রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো। ১৯৮০ সালে যেখানে মাত্র ১০টি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ছিল; এখন তা বেড়ে প্রায় দুই হাজার হয়েছে। এর মধ্যে ১০০৬টি রিহ্যাবের নিবন্ধিত সদস্য। তা সত্ত্বেও রিয়েল এস্টেট মার্কেটের প্রায় ৯৫ শতাংশই মাত্র ১০-১৫টি ডেভেলপার কোম্পানির হাতে, যাদের কার্যক্রম মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে সীমাবদ্ধ। অপরদিকে দেশের প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাষ্ট্র্রায়ত্ত বিশেষায়িত বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন এবং বেসরকারি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিও গৃহঋণ প্রদান করে থাকে।
গৃহনির্মাণ এবং ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত আয় শ্রেণির জনগণ। দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয় শ্রেণি বাস্তবে গৃহঋণ সুবিধার ১ শতাংশও পাচ্ছে না। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন দেশের সব জেলা শহর, উপজেলা সদর, পেরি-আরবান ও গ্রোথ সেন্টারগুলোতে ঋণ প্রদান করে থাকে। দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং বিশেষ করে নিম্ন-আয় শ্রেণির আবাসন খাতে অর্থায়নে 'সকলের জন্য আবাসন' নিশ্চিতকরণে ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন সীমিত মূলধনকে পুঁজি করে গৃহঋণ সেবা সবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি প্রতি বছর মুনাফা অর্জন করছে। অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি গৃহঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে সিটি করপোরেশনগুলোর বাইরে এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল গ্রাহক ছাড়া গৃহঋণ প্রদানে অনাগ্রহী, সেখানে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন দেশের উপজেলা পর্যায়ে গৃহনির্মাণে অর্থায়ন করে থাকে। সম্প্রতি ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে পেরি-আরবান ও গ্রাম পর্যায়ে গৃহঋণ প্রদান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং 'কৃষক আবাসন ঋণ' নামে ঋণ প্রোডাক্ট চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের নামে ঋণপ্রত্যাশীরা অভিযোগ করে থাকেন যে, ঋণ গ্রহণে ডকুমেন্টসের চাহিদা অনেক এবং ঋণ মঞ্জুরি ও বিতরণ প্রক্রিয়াতে সময় লাগে বেশি।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের ফলে শহরমুখী জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ এবং পূর্বের অপরিকল্পিত নগরায়ন ব্যবস্থার যুগপৎ সংমিশ্রণে সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করা অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলাফলস্বরূপ, আবাসনের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার ফলে আবাসযোগ্য জমির দাম, নির্মাণসামগ্রী এবং ফ্ল্যাটের মূল্য জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। জমি এবং আবাসন-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় লাগামহীন দুর্নীতি বিদ্যমান; সেইসঙ্গে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
জমি ক্রয় থেকে শুরু করে বাড়ি পুরোপুরি তৈরি করার প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। জমি ক্রয়ে প্রতারণা ও ছল-চাতুরী, রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, খাজনা-সংক্রান্ত ভোগান্তি, ব্যাংক লেনদেনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সমস্যা ও হয়রানির শেষ নেই। উপরন্তু প্রতিটি ধাপে দালালদের দৌরাত্ম্য তো আছেই।
গৃহঋণ পেতেও গ্রাহকদের নানান অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। উচ্চ সুদের হার, দলিলাদি এবং বন্ধকি-সংক্রান্ত জটিলতা, নকশা প্রণয়নে কালক্ষেপণ ও ভোগান্তি এবং গৃহঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা প্রদানে অসহযোগিতা তো রয়েছেই। তবে গ্রাহকদের ভোগান্তি বেশি হয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। কারণ গৃহঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং জমির স্বত্ব নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও সমন্বয়ের যথেষ্ট ঘাটতি বিদ্যমান।
বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার প্রত্যেকের মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা করে দেওয়াটা খুবই কঠিন। তবুও সরকারকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে এবং তার জন্য জরুরি গৃহায়ন খাতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং তার থেকেও জরুরি সমন্বয়। দুর্নীতি বন্ধের পাশাপাশি আবাসন খাতে গ্রাহকদের সেবা প্রদানের ওপর অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। সুদের হার, রেজিস্ট্রেশন, প্রসেসিং ফি; সর্বোপরি নীতিমালা সংশোধন পুনঃতফসিলীকরণ, মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি মনিটরিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সরকারের সুদৃষ্টি এবং সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে আরও উন্নত ও জনমুখী গৃহায়ন খাত গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের পরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে কর্মরত
প্রায় প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য এবং প্রধান চাহিদা নিজের একটি বাড়ি। এই চাহিদা পূরণে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গৃহনির্মাণ, গৃহঋণ প্রদান ও প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দের ব্যবস্থা করে আসছে। গৃহনির্মাণে সরাসরি জড়িত রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো। ১৯৮০ সালে যেখানে মাত্র ১০টি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ছিল; এখন তা বেড়ে প্রায় দুই হাজার হয়েছে। এর মধ্যে ১০০৬টি রিহ্যাবের নিবন্ধিত সদস্য। তা সত্ত্বেও রিয়েল এস্টেট মার্কেটের প্রায় ৯৫ শতাংশই মাত্র ১০-১৫টি ডেভেলপার কোম্পানির হাতে, যাদের কার্যক্রম মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে সীমাবদ্ধ। অপরদিকে দেশের প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাষ্ট্র্রায়ত্ত বিশেষায়িত বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন এবং বেসরকারি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিও গৃহঋণ প্রদান করে থাকে।
গৃহনির্মাণ এবং ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে উচ্চ এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত আয় শ্রেণির জনগণ। দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয় শ্রেণি বাস্তবে গৃহঋণ সুবিধার ১ শতাংশও পাচ্ছে না। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এবং বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন দেশের সব জেলা শহর, উপজেলা সদর, পেরি-আরবান ও গ্রোথ সেন্টারগুলোতে ঋণ প্রদান করে থাকে। দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং বিশেষ করে নিম্ন-আয় শ্রেণির আবাসন খাতে অর্থায়নে 'সকলের জন্য আবাসন' নিশ্চিতকরণে ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন সীমিত মূলধনকে পুঁজি করে গৃহঋণ সেবা সবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি প্রতি বছর মুনাফা অর্জন করছে। অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি গৃহঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে সিটি করপোরেশনগুলোর বাইরে এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল গ্রাহক ছাড়া গৃহঋণ প্রদানে অনাগ্রহী, সেখানে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন দেশের উপজেলা পর্যায়ে গৃহনির্মাণে অর্থায়ন করে থাকে। সম্প্রতি ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে পেরি-আরবান ও গ্রাম পর্যায়ে গৃহঋণ প্রদান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং 'কৃষক আবাসন ঋণ' নামে ঋণ প্রোডাক্ট চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের নামে ঋণপ্রত্যাশীরা অভিযোগ করে থাকেন যে, ঋণ গ্রহণে ডকুমেন্টসের চাহিদা অনেক এবং ঋণ মঞ্জুরি ও বিতরণ প্রক্রিয়াতে সময় লাগে বেশি।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের ফলে শহরমুখী জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ এবং পূর্বের অপরিকল্পিত নগরায়ন ব্যবস্থার যুগপৎ সংমিশ্রণে সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করা অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলাফলস্বরূপ, আবাসনের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার ফলে আবাসযোগ্য জমির দাম, নির্মাণসামগ্রী এবং ফ্ল্যাটের মূল্য জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। জমি এবং আবাসন-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় লাগামহীন দুর্নীতি বিদ্যমান; সেইসঙ্গে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
জমি ক্রয় থেকে শুরু করে বাড়ি পুরোপুরি তৈরি করার প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। জমি ক্রয়ে প্রতারণা ও ছল-চাতুরী, রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, খাজনা-সংক্রান্ত ভোগান্তি, ব্যাংক লেনদেনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সমস্যা ও হয়রানির শেষ নেই। উপরন্তু প্রতিটি ধাপে দালালদের দৌরাত্ম্য তো আছেই।
গৃহঋণ পেতেও গ্রাহকদের নানান অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। উচ্চ সুদের হার, দলিলাদি এবং বন্ধকি-সংক্রান্ত জটিলতা, নকশা প্রণয়নে কালক্ষেপণ ও ভোগান্তি এবং গৃহঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা প্রদানে অসহযোগিতা তো রয়েছেই। তবে গ্রাহকদের ভোগান্তি বেশি হয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। কারণ গৃহঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং জমির স্বত্ব নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও সমন্বয়ের যথেষ্ট ঘাটতি বিদ্যমান।
বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার প্রত্যেকের মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা করে দেওয়াটা খুবই কঠিন। তবুও সরকারকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে এবং তার জন্য জরুরি গৃহায়ন খাতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং তার থেকেও জরুরি সমন্বয়। দুর্নীতি বন্ধের পাশাপাশি আবাসন খাতে গ্রাহকদের সেবা প্রদানের ওপর অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। সুদের হার, রেজিস্ট্রেশন, প্রসেসিং ফি; সর্বোপরি নীতিমালা সংশোধন পুনঃতফসিলীকরণ, মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি মনিটরিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সরকারের সুদৃষ্টি এবং সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে আরও উন্নত ও জনমুখী গৃহায়ন খাত গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের পরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে কর্মরত
