দিল মনোয়ারা মনুর খ্যাতি

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০১৯

কামাল লোহানী

একসময় আমাদের দেশে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল বলতে গেলে হাতেগোনা। দিল মনোয়ারা মনু সেই সময়ের সাংবাদিক। লেখালেখির জগতে তার উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তাকে নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। আমি আমার কর্মজীবনে তাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক হিসেবেই দেখেছি। সাংবাদিকতা জগতে তার বিচরণ ছিল দীর্ঘদিনের। আলস্য তাকে কখনও চেপে ধরেনি, রোগব্যাধিও তার কর্মোদ্যোগ থামাতে পারেনি। আমি দিল মনোয়ারা মনুকে একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবেই জানি। এও জানি, সাংবাদিকতার বাইরেও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার সরব উপস্থিতি ছিল। সাংবাদিক সমাজের প্রতি তার অঙ্গীকারও ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের অধিকারের জন্য তিনি সবসময়ই ছিলেন সোচ্চার। সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি সাংবাদিকতাকেই মূল ক্ষেত্র মনে করতেন। মানবিকতা, মুক্তিযুদ্ধ, অধিকার আদায়ের অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা গেছে তার লেখালেখিতেও। সব ক্ষেত্রেই তার একটা নির্মোহ প্রচেষ্টা ছিল। তার এই প্রচেষ্টার আলো তাকে অধিকতর আলোকিত করেছিল। সাংবাদিকতার বিষয়ে তার আগ্রহ তাকে এ জগতে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি কাজের ক্ষেত্রে সবসময় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। বিনয়ী, পরোপকারী, সদালাপী, দৃঢ়চেতা দিল মনোয়ারা মনু একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে অনেক কিছুরই স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন গোছালো। একজন মুক্ত ও আদর্শিক চিন্তার মানুষকে তিনি পেয়েছিলেন জীবনসঙ্গী হিসেবে। তার জীবনসঙ্গী শামসুল হুদা ছিলেন তার কাজের বড় অনুপ্রেরক। একজন জীবনসঙ্গী যখন কোনো কিছুর অনুপ্রেরক হন, তখন এর প্রতিফলনটাও ব্যক্তি ও কর্মজীবনে দ্যুতি ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বেশি সহায়ক হয়ে ওঠে। মনুর জীবনে তাই হয়েছিল। তাদের দাম্পত্য জীবনের বন্ধনটা ছিল অত্যন্ত মধুর। দ্বৈত জীবনের বোঝাপড়া ছিল অটুট। আর এ কারণেই দিল মনোয়ারা মনুর এগিয়ে চলার পথটা ছিল মসৃণ। 'পাক্ষিক অনন্যা'র নির্বাহী সম্পাদক থাকাকালে তার কর্মদক্ষতার ছাপ বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। সম্পাদনা, লেখালেখি, সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সমভাবেই আলো ছড়িয়ে গেছেন মনু। তার ৬৯ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের কর্মোদ্দীপনার যে চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, তিনি ছিলেন আমাদের একজন আলোকিতজন। দিল মনোয়ারা মনু নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ 'বেগম' পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগমের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। সেখান থেকে তিনি নিজেকে পুষ্ট করার পথ রচনা করেন। এই পথ তাকে আরও নতুন পথের সন্ধান দেয়। নতুন পথে হেঁটেও তিনি সফলতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তিনি ছিলেন নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহসভাপতি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির গণমাধ্যম সম্পাদকও ছিলেন। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলাসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পৃক্ততা ছিল। মনু ছিলেন কর্মমুখর প্রাণবন্ত একজন মানুষ। একটানা ২৫ বছর তিনি 'পাক্ষিক অনন্যা'র বিভিন্ন পদে কাজ করে নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনায় ঋদ্ধ দিল মনোয়ারা মনুর নিস্কলুষ জীবনাদর্শ তাকে স্মরণযোগ্য করেই রাখবে। মানুষের কাজের স্বীকৃতিই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষ তার কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে পরিসর বিস্তৃত করে। দিল মনোয়ারা মনু তাই করে গেছেন। আর এ জন্যই তিনি তার কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ 'অনন্যা' কর্তৃক আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। তিনি বেঁচে থাকবেন তার কর্মের মধ্য দিয়েই। দিল মনোয়ারা মনুর কর্মের সংকল্পকে শ্রদ্ধা করি। কর্মক্ষেত্রে তার যে অসামান্য অবদান রয়েছে, তা অনুজদের জন্য অনুসরণযোগ্য

হয়ে থাকবেন।

প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব