ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবকিছু ছাপিয়ে একজন সংস্কৃতিকর্মী

সবকিছু ছাপিয়ে একজন সংস্কৃতিকর্মী

আসাদুজ্জামান নূর

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ | ১৬:২১ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৫:৫৩

আজ আসাদুজ্জামান নূরের জন্মদিন। তাকে আমি জানি সংস্কৃতিকর্মী হিসেবেই। ইতোমধ্যে তিনি রাজনীতিক হয়েছেন, ব্যবসায়ীও হয়েছেন; কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তিনি একজন সংস্কৃতিকর্মী। তার এই সংস্কৃতিকর্মের সূচনা তার নিজ ছোট্ট শহর নীলফামারী থেকে। নীলফামারী ছোট্ট শহর হলেও ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি সমৃদ্ধ এবং প্রান্তিক শহর হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেরও একটা ছোঁয়া ছিল। জেনেছি, সেই স্কুলজীবন থেকেই তার শিল্পকর্মের উন্মেষ। বাবা-মা দু'জনই শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা ছাড়াও তারা রাজনীতি ও সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন। সে সুবাদে রংপুর-ঢাকা আসা-যাওয়া শুরু হয় সেই দুর্গম ট্রেনযাত্রায়। ষাটের দশকে তিনি সংস্কৃতি সংসদের সদস্য, ছাত্র রাজনীতির সার্বক্ষণিক কর্মী। সেই সঙ্গে আবৃত্তি শিল্পী এবং সাংগঠনিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত। ওই সময় আমাদের যা হয়েছিল- একদিকে ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র রাজনীতি, সব দলমত নির্বিশেষে একই মিছিলে হাঁটা এবং গণঅভ্যুত্থানের উষ্ণতা নিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। নূর তাই করেছেন এবং যুদ্ধ শেষে অস্ত্র ছেড়ে আবার সংস্কৃতিকর্মেই ফিরে এসেছেন। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় আমরা খোদ এরশাদের জায়গা রংপুরে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিয়ে যখন ফিরছি, তখনই রংপুর শহরের উপকণ্ঠে আমাদের মাইক্রোবাস আক্রমণের শিকার হলো। বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেলে চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো আমাদের গাড়ির কাচ। পরে কোনো রকমে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসি। এ রকম ঘটনা আরও দু'একবার ঘটেছে।
সে সময় নাট্য আন্দোলন ব্যাপক জোয়ার সৃষ্টি করে। সংস্কৃতিকর্মীরা চোখ তুলে তাকালেন এই বিস্ময়কর অভিযানে। নূরের হয়তো অভিনয়ের কোনো বাসনা ছিল না। কিন্তু কোনো একজন অভিনেতার অনুপস্থিতিতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যান। সেই হলো তার নবযাত্রা। এমনিতেই চমৎকার কণ্ঠ, সুদর্শন, পরিশীলিত উচ্চারণ- সব মিলিয়ে মঞ্চে অভিনয়ের একটা জায়গা হয়ে গেল। সেই সঙ্গে টেলিভিশনেও। মঞ্চ অভিনয়ের একটা বড় স্বীকৃতি মিলে গেল 'নূরলদীনের সারাজীবন'-এর আব্বাস চরিত্রে। এ সময় দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। সেখানে একটি সক্রিয় নেতৃত্বের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলেন নূর। একদিকে আবৃত্তিকার, অন্যদিকে অভিনেতা দুটির একটা সেতুবন্ধ হয়ে গেল এই আন্দোলনে। দেশব্যাপী এই গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় আমরা হাতে হাত মিলিয়ে চললাম। নানা ধরনের ঝুঁকি, প্রতিকূলতা, আক্রমণকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলল আমাদের অভিযান।
স্বৈরাচারের পতনের পর বৃহত্তর জীবনের আহ্বানেই চলে গেলেন সরাসরি রাজনীতিতে। দুর্নিবার সেই আকর্ষণ গণমানুষের কাছে যাওয়ার। একদিকে দরিদ্র-নিরন্ন মানুষের ডাক, অন্যদিকে কুটিল ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। তবুও তার মধ্যে জায়গা করে নিয়ে রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলেন। চারুশিল্পী, গায়ক-গায়িকা, আবৃত্তিশিল্পী আর অভিনেতা-অভিনেত্রী তো আছেই। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক ব্যস্ততা। এত দিক সামলানো তার পক্ষেই সম্ভব; কারণ অসম্ভব স্থৈর্যতায়। সাধারণত উত্তেজিত হন না। বিরক্ত হলেও মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন। এ এক বিরল গুণ। এই করে করেই অনেক বসন্ত চলে গেল, গত হয়ে গেল অনেক ঝঞ্ছা-বিক্ষুব্ধকাল। শত ঝড়-ঝঞ্ছা অতিক্রম করে আমাদের এই দেশে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। উন্নয়নের জোয়ার বইছে; কিন্তু কোথায় যেন একটা বড় ফাঁক হয়ে গেছে। মানবিক মূল্যবোধ কমে যা হয়েছে তার খবর আমরা প্রায়ই পাই। এই মূল্যবোধের স্খলন কমাতে পারত আমাদের সংস্কৃতি। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সৃজনশীল মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন করা বড়ই জরুরি ছিল। তাই বারবার সভা-সমিতিতে এবং ব্যক্তিগত আড্ডায় নূরকে খোঁচা দিতাম, চাপ দিতাম ফিরে আসার জন্য। রাজনীতি একটা নিত্যদিনের প্রয়োজন, তার জন্য এক ধরনের মানুষও আছেন; কিন্তু শিল্পী কদাচিৎ জন্মায়। সমাজে তাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আশার কথা, নূর আবার অভিনয়ে ফিরে এসেছেন। অভিনয় জরুরি; কিন্তু তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন। তার জন্য একটু বেশি সময় চাইছি বন্ধু আসাদুজ্জামান নূরের ৭৪তম জন্মদিনে।
নবজন্মের দ্বারপ্রান্তে আজ নতুন করে উদ্ভাসিত হোক নতুন ভাবনা।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×