দুনিয়ার মজদুর বিভক্ত হও!
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নদীর মিল রয়েছে। নদী যেমন কারণে-অকারণে ভাঙে, বিশেষত বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলোও তেমনই ভাঙনপ্রবণ। কথায় কথায় ভাঙে বললেও অত্যুক্তি হয় না। বলা বাহুল্য, ভাঙনে নদীর ক্ষতি বৈ লাভ হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভাঙনে ক্ষতি আরও বেশি। দল ভেঙে দুই পক্ষ না হোক, এক পক্ষ লাভবান হয়েছে- এমন নজির আমাদের রাজনীতিতে বিরল। ফেসবুকে একজন কমেন্ট করেছেন, নদী ভাঙলে বড় হয়, আর রাজনৈতিক দল ভাঙলে ছোট হয়।
বামপন্থি দলগুলো কেন ভাঙে? ওয়ার্কার্স পার্টির সাম্প্রতিক ভাঙন দেখে প্রশ্নটা মনে এসেছিল। মহামতি লেনিন বলছেন- 'বৈপ্লবিক পরিস্থিতি ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব।' আমাদের বামপন্থি দলগুলো সবসময় ভাঙাগড়ার মাধ্যমে কি 'বৈপ্লবিক পরিস্থিতি' বজায় রাখতে চায়? কে জানে!
আশির দশকের গোড়ায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগসহ কয়েকটি দলের একত্রীকরণের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল ওয়ার্কার্স পার্টি। আশির দশকেই ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্ত অংশগুলো মিলে যেভাবে ছাত্র মৈত্রী গঠন এবং ওয়ার্কার্স পার্টির গণসংগঠন হিসেবে যোগদান করে, তাও কম উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না। যদিও মাত্র বছর চারেকের মাথায় মূল দলই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল; নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় ফের একত্র হতে দ্বিধা করেনি। একুশ শতকে এসে অবশ্য ওয়ার্কার্স পার্টি আরও দু'বার ভেঙেছে। প্রথমবার ২০০৮ সালে একটি অংশ বেরিয়ে এসে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করে। ২০০৯ সালে বেরিয়ে যায় আরেকটি অংশ। সেই অংশেরও একটি অংশ পরবর্তীকালে সিপিবিতে এবং আরেকটি অংশ ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগে যোগ দেয়। নানা অর্থে 'মূলধারা' রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টি আবার ভাঙছে। দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সর্বোচ্চ পরিষদ পলিটব্যুরো সদস্য বিমল বিশ্বাসের নেতৃত্বে আরও ছয় কেন্দ্রীয় নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির আসন্ন কংগ্রেস বর্জনের ডাক দিয়েছেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে যা হয়, আগামীকাল শনিবার থেকে শুরু হওয়া ওয়ার্কার্স পার্টির জাতীয় কংগ্রেসে তাই হবে। ইতোমধ্যে দেখা গেছে, বিমল বিশ্বাস যদিও নিজেকে দল থেকে 'প্রত্যাহার' করে নিয়েছেন, দল তাকে 'বহিস্কার' করেছে। অনিবার্যভাবে আসন্ন কংগ্রেসে বাকিদেরও বহিস্কারই করা হবে। 'ধ্রুপদি' নিয়ম মেনে হয়তো গঠিত হবে আরেকটি ওয়ার্কার্স পার্টি বা তারা অন্য কোনো দলে যোগ দেবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এ ভাঙন? বেরিয়ে যাওয়ারা বলছেন, দলের আদর্শচ্যুতি ঘটেছে। আর থেকে যাওয়ারা বলবেন, তারা 'শৃঙ্খলা ভঙ্গ' করেছেন। কেবল ওয়ার্কার্স পার্টি নয়, এর আগে জাসদ, বাসদের বিভিন্ন ভাঙনে দুই পক্ষের একই বক্তব্য দেখা গেছে। এবারও ব্যতিক্রম ঘটার কোনো কারণ নেই।
ভাঙনের কারণ হিসেবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে যাই বলা হোক- দল ভেঙে নতুন দল গঠন কিংবা অন্য দলে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সেটা মনে রাখার নজির বিরল। কয়েক বছর আগে বাসদ ভেঙে গঠিত হয়েছিল বাসদ (মার্কসবাদী)। দলে একসঙ্গে থাকতে না পারলেও পরে দুই পক্ষই যোগ দিয়েছিল অভিন্ন 'বাম গণতান্ত্রিক জোটে'। জাসদে (ইনু) সর্বশেষ ভাঙনের পর দুই পক্ষই ক্ষমতাসীন ১৮ দলীয় জোটের অংশ। আদর্শ ও মতের পার্থক্য সত্ত্বেও যদি জোটে একসঙ্গে থাকা যায়, তাহলে মতপার্থক্য নিয়েই এক দলে থাকলে কী সমস্যা, বোধগম্য নয়। ওয়ার্কার্স পার্টির যে অংশ দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নৈকট্যের বিরোধিতা করে ওয়ার্কার্স পার্টি ছেড়েছিল, তারাই আবার সিপিবিতে যোগ দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে নৈকট্যের প্রশ্নে ওয়ার্কার্স পার্টি ও সিপিবির কী এমন যোজন যোজন দূরত্ব?
ওয়ার্কার্স পার্টির একুশ শতকের দুই দফা ভাঙন, গঠন ও যোগদান প্রক্রিয়ায় কিছু সক্রিয় নেতাকর্মী নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে গেছে। জাসদের প্রত্যেক দফা ভাঙনেও তাই ঘটেছে। বাসদ থেকে বাসদ মার্কসবাদী ভাঙন প্রক্রিয়াতেও একই ঘটনা। এখন শোনা যাচ্ছে, মার্কসবাদী অংশেও দেখা দিয়েছে বিভক্তি। বাসদের সাধারণ সম্পাদক একবার ব্যক্তিগত আলাপকালে ভাঙনের প্রবণতা ও পরিণতি নিয়ে কৌতুক করে বলেছিলেন, কিছু স্টিকার বানানো দরকার। যেখানে লেখা থাকবে- 'কমরেড কী লাভ হলো?'
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা চলছে। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ যতটা শক্তিশালী হয়েছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যেন ততটাই শক্তি খুইয়েছে। অপর দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্ব ও মাঠ পর্যায়ে বিপর্যস্ত। এইচএম এরশাদের মৃত্যুর পর জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি কতদূর যাবে দেখার বিষয়। সাদ এরশাদের নির্বাচিত হয়ে আসা এবং স্বল্পতম সময়ের মধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর দেবর-ভাবির ঠাণ্ডা যুদ্ধ চাচা-ভাতিজার গৃহদাহে পরিণত হতে খুব বেশি ইন্ধন প্রয়োজন হবে না।
বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলোর হারানো প্রভাব ও গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য এটাই ছিল মোক্ষম সময়। বামপন্থি ঐক্য আওয়ামী লীগের বিপরীতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দল জন্ম দিতে পারত। দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন কাঠামো যখন সর্বাত্মক পুঁজিবাদের দিকে ধাবিত, তখন খেটে খাওয়া মানুষের ভরসা হতে পারত অন্তত আদর্শগত দিক থেকে কৃষক, শ্রমিক, মজদুরের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য। কিন্তু আমাদের বামপন্থি দলগুলো এ ব্যাপারে আগ্রহী কি-না, সেটাই এখন প্রশ্ন।
পরিহাসের বিষয়ই বটে- দুনিয়ার মজদুরকে এক হওয়ার স্লোগান যারা দেয়, তারাই স্বদেশীয় মজদুরদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করে সবচেয়ে বেশি।
লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com
