ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে চোরাচালান ধরাছোঁয়ার বাইরে চক্রের সদস্যরা

প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে চোরাচালান ধরাছোঁয়ার বাইরে চক্রের সদস্যরা
×

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গারো পাহাড়ে কিছুতেই থামছে না চোরাচালান। প্রতি মাসে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ভারতীয় ওষুধ, কসমেটিক, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিজিবির হাতে ধরা পড়ছে। কখনও মুড়ির বস্তায়, কখনও ডোবার পানিতে পুঁতে রাখা হাজারো বোতল মদের চালান জব্দ হচ্ছে। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে জড়িতরা। উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় লোকজন প্রশ্ন তোলেন, গত দুই-আড়াই বছরে শতকোটি টাকা মূল্যের চোরাই পণ্য ধরা পড়লেও জড়িত রাঘববোয়ালরা কেন ধরা পড়ছে না? যদি তারা ধরা পড়ত, তাহলে কিছুতেই চোরাচালানের এত বিস্তার হতো না।

গারো পাহাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চোরাচালান চক্র বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করেছে। তারা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে এই অবৈধ ব্যবসা চালাচ্ছে। অস্বাভাবিক মুনাফা হওয়ায় কোটি টাকার পণ্য ধরা পড়লেও তোয়াক্কা করেন না। তবে সীমিত জনবল দিয়ে বিজিবি এককভাবে চেষ্টা করছে চোরাচালান ঠেকাতে। কিন্তু মালপত্র ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ায় ধরা পড়ছে না চোরাচালান চক্রের সদস্যরা।

বিজিবি সূত্র জানায়, গত আগস্ট মাসেই সীমান্তের ওপার থেকে গারো পাহাড় দিয়ে আনা প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্য জব্দ করেছেন তারা। এর মধ্যে ২৯ আগস্ট পৃথক অভিযানে বিজিবি সদস্যরা ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের গুরুচরণ দুধনই ও নালিতাবাড়ীর পোড়াবাড়ি এলাকা থেকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৭০৫ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ করা হয়। এর মধ্যে শতাধিক বোতল মদ তিনটি বস্তায় ভরে একটি জলাশয়ে পুঁতে রাখা ছিল। এর আগে ৬ আগস্ট নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাতা এলাকায় ধরা পড়ে ৮১ লাখ ২০ হাজার ৮০০ টাকার ভারতীয় ওষুধ। তার পাশের এলাকা হালুয়াঘাট উপজেলার বান্দরকাটা থেকে গত ২৭ আগস্ট অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনের বিপুল পরিমাণ ডিসপ্লে জব্দ করা হয়। বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারি চক্র এসব পণ্য ফেলে পালিয়ে যায়। এগুলোর মূল্য ৪৮ লাখ ৫১ হাজার টাকা বলে জানায় বিজিবি।

গত ১১ আগস্ট ভোরে শ্রীবরদী উপজেলার সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়নে গারো পাহাড়ের গহিন জঙ্গল চান্দাপাড়া এলাকায় অভিযান চালায় বিজিবির টহল দল। এ সময় চোরাকারবারিরা কসমেটিকস ও গরু ফেলে পালিয়ে যায়। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকার প্রসাধন সামগ্রী ও প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের চারটি গরু। একই এলাকায় ১৮ আগস্ট উদ্ধার হয় সাড়ে ৮ লাখ টাকার কসমেটিকস। 
সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়নের পাঁচমেঘাদল দিয়ে গত ১৪ আগস্ট ভারতীয় কসমেটিকস বাংলাদেশে পাচারের চেষ্টা করে চোরাকারবারিরা। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে মালপত্র ফেলে পালায় চক্রটি। এ সময় উদ্ধার হয় নামিদামি ব্র্যান্ডের ১৮ লাখ ২ হাজার টাকার কসমেটিকস। একই দিনে নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরে বিশেষ অভিযানে উদ্ধার হয় আড়াই লাখ টাকা মূল্যের ১৬৯ বোতল মদ। গত ১৬ আগস্ট শ্রীবরদী সীমান্তের বৈষ্ণবপাড়া থেকে ১৫৩ বোতল মদ জব্দ করা হয়, যার মূল্য ২ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এ ঘটনায় ৪ জনের বিরুদ্ধে শ্রীবরদী থানায় মামলা হয়েছে তবে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
গত বুধবার বিজিবির টহল দল কর্ণঝোড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন প্রকার কসমেটিকস ও একটি ইজিবাইক জব্দ করে। যার মূল্য ১১ লাখ ৪০ হাজার ৩০০ টাকা।
চোরাই পণ্য জব্দের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কর্ণঝোড়া বিওপির নতুন ইনচার্জ সুবেদার ফুল মিয়া সরকার। এর বাইরে তিনি আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে ৩৯ বিজিবির অধিনায়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

চোরাই পণ্য উদ্ধার ও জড়িতদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়া সম্পর্কে স্থানীয় ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের মত ব্যক্ত করেছেন। সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়নের হারিয়াকোনার বাসিন্দা মিথুন সাংমা জানান, সীমান্তের গভীর জঙ্গল দিয়ে মূলত চোরাচালান হয়। এর সঙ্গে এলাকার প্রভাবশালী লোকজন জড়িত। এই এলাকায় আদিবাসী লোকজন বসবাস করেন। তারা অনেক কিছু জেনেও নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে কাউকে কিছু বলেন না। তবে বিজিবি সদস্যরা সীমিত জনবল নিয়ে  ভালোই কাজ করছে। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারি চক্র মালপত্র ফেলে পালিয়ে যায়। এমন সব জায়গা দিয়ে পালায়, যেখানে বিজিবি সদস্যদের যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, বড় চালান ধরা পড়লে এ কাজে জড়িতরা পাত্তাই দেন না। আসলে যা ধরা পড়ছে, মনে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য তারা পাচার করতে সমর্থ হয়। তাই তারা কোনো কিছুর পরোয়া করে না। বিজিবির একার পক্ষে সীমান্তে চোরাচালান পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।
সিঙ্গাবরুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকরুজ্জামান কালুর ভাষ্য, প্রতাপশালী লোকজন চোরাচালানে জড়িত। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন সমাজসেবা করছি। কোনো খারাপ কাজে জড়িত হইনি। যারা অবৈধ ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রাণের ঝুঁকি আছে।’
সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আতাউর রহমান স্থানীয় ভাষায় বলেন, ‘এইল্লা কওয়া যাব না। কইলে থাহা যাব না। যারা প্রতাপশালী তারাই করছে।’

চোরাচালান বন্ধে পদক্ষেপ জানতে চাইলে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহম্মেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আমরাও খেয়াল করছি– চোরাচালান বাড়ছে। বিষয়টি বিজিবির এখতিয়ারভুক্ত। পুলিশকেও বলা হয়েছে, সীমান্ত যেন চোরাচালানের রুট না হয়ে পড়ে। আমরা সতর্ক রয়েছি।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল মালেক জানান, গত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিজিবি প্রতিনিধিকে বলা হয়েছে, সীমান্তে চোরাই পণ্য জব্দের পাশাপাশি জড়িতদের আটকে তৎপর হতে হবে।
ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরুল আজিম বায়েজীদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিজিবি সদস্যরা আন্তর্জাতিক সীমানা রক্ষা, মাদক চোরাচালান এবং অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে কঠোর নীতি অনুসরণ করছে।
 

আরও পড়ুন

×