ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বর্ষবরণ

মঙ্গলের জন্য শোভাযাত্রা

মঙ্গলের জন্য শোভাযাত্রা
×

সঙ্গীতা ইমাম

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৩ | ১৯:০২

বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন কারণে একটি শব্দযুগলের মুখোমুখি হই আমরা– ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’। প্রায়ই এ দেশের এক শ্রেণির মানুষ বলে থাকে, তাদের ধর্মীয় চেতনায় আঘাত লেগেছে বলে তারা সংক্ষুব্ধ। এই ধর্মানুভূতি নিয়ে দেশে কম রাজনীতি চলে না। প্রগতিশীল লেখক-ব্লগার-প্রকাশক-সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের মতো বর্বর ঘটনাও ঘটেছে এই ‘ধর্মানুভূতি’ নিয়ে। আজকাল সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করতে এই শব্দযুগলের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। কখনও পহেলা বৈশাখ উদযাপন বা মঙ্গল শোভাযাত্রা, কখনও বাউল গানের আসর, আবার কখনও ধর্মেরই নানা প্রথা নিয়ে এই অনুভূতির রাজনীতি চলছে। অথচ বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের বিকাশের ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, শত শত বছরের এই ঐতিহ্য একই ধর্ম পালনকারীকে কখনও বিব্রত করেনি। যুগ যুগ ধরে কারও ধর্মীয় অনুভূতি আক্রান্ত হয়নি। ইদানীং কেন তবে আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি এতটা স্পর্শকাতর হয়ে উঠল? কেন কথায় কথায় আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়? আগেও বলেছি, এটি একটি রাজনৈতিক চাল। বাঙালি-বাংলার মানুষের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিলীন করার অপচেষ্টা। খুব সুকৌশলে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন উৎসব আয়োজনকে উপলক্ষ বানিয়ে একেক ফতোয়ার উদ্ভাবন করা হয়।

এ অঞ্চলের মানুষ সব সময় উৎসবপ্রিয়। তাই তো এ দেশকে বলা হয় ‘বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ’। যদিও ধরন ও বৈচিত্র্যে বাংলার উৎসব আরও বেশি। ধান পাকলে কৃষক আনন্দে গান গেয়ে ধান কাটে। এতে থাকে সামনের দিনগুলোয় খেয়ে বাঁচার নিশ্চয়তা আর কায়িক শ্রম লাঘবের প্রয়াস। এই ধান ঘরে নেওয়ার পরে যখন কিষানিরা উঠানে ধান ছড়িয়ে পা দিয়ে নেড়ে নেড়ে শুকায় বা শুকনো ধান ঢেঁকিতে ফেলে ‘ও ধান ভানি রে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া…’ গান ধরে, তখন তা কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীর নয়। এ হলো কিষানির গান। আমাদের সংস্কৃতির এক অনবদ্য রূপ। ব্লাউজ ছাড়া যে ডুরে শাড়িতে কিষানি সাজে; ঢেঁকিতে পাড়ের ছন্দে নাকে দোলে নথ আর রিনিঝিনি বাজে কাচের চুড়ি– এ কার ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে? নৌকা বাইতে বাইতে মাঝির কণ্ঠের ভাটিয়ালি, অসমতল রুক্ষ মাটির ওপর গরুর গাড়ির গমকের সুরের ভাওয়াইয়া তো এ মাটির সংস্কৃতি। বাউলের একতারার সুর আর বাবরি চুল, সাধনসঙ্গী নিয়ে গ্রামের পথে পথে গান গেয়ে ভিক্ষা করার দৃশ্য তো বাঙালি বলতে পারবে না, কবে থেকে দেখছে। কারণ এ তার বিকাশ পর্বেরই অংশ। তিন প্রজন্ম আগের মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও বলবেন, তাঁর দাদির কাছে বাউলদের গান শুনেছেন। তাহলে আজ কেন বাউলদের চুল-দাড়ি কেটে, বাদ্যযন্ত্র ভেঙে, গানঘরে আগুন, গানের খাতা পুড়িয়ে দিতে হবে ধর্মানুভূতির দোহাই দিয়ে? এতই যদি ধর্মানুভূতি কচলানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে– আমাদের সাংস্কৃতিক অনুভূতি কি কখনোই আঘাতপ্রাপ্ত হয় না?

বাংলায় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে কত শত সহস্র বছর ধরে! এখন তারা যদি বলে, ওয়াজের নামে বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানো হয়; তাতে তাঁদের অনুভূতিতে আঘাত লাগছে। কিংবা নারী হিসেবে আমাকে যেভাবে অবমাননাকর কথা শুনতে হয় খুতবা বা ওয়াজ নামের বিভিন্ন বক্তব্যে, তাতে তো আমারও নারীত্বের অনুভূতি বা মানুষ হিসেবে অনুভূতিতে আঘাত লাগে। আমরা আসলে সংগঠিত নই, তাই সংঘবদ্ধভাবে এদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইটা করি না। আমরা পথে আন্দোলন করি, বক্তৃতা দিই।

ক’জন শুনল বা মনে নিল, সেটা না বুঝেই তৃপ্তি পাই। তা না হলে মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে উকিল নোটিশ পাঠানো কাঠমোল্লা আইনজীবীকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো আইন কি নেই? বিষয় নয় শুধু; তাঁর উকিল নোটিশের বক্তব্যও তো ভুল। শব্দ আবার কী করে ধর্মীয় হয়? কোন ব্যাকরণে শব্দের ধর্মগত শ্রেণিবিভাগ আছে? আমরা বাংলার জনতাকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালে পালানোর পথ পাবে না এই মৌলবাদী আইনজীবীরা।

‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বাঙালির ঐতিহ্য নয় বলে ফতোয়া দিচ্ছে অনেকেই। কিন্তু একে বিশ্বঐতিহ্যের অংশ হিসেবে (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) গণ্য করছে বিশ্ববাসী। পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আমাদের কাছ থেকে প্রাণিত হয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করছে। তাদের এই উদযাপনকে তো কোনো আইনি নোটিশ ঠেকাতে পারবে না। মঙ্গল শোভাযাত্রার মোটিভ চরিত্রগুলো নানাভাবে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেখান থেকে তুলে এনেই শোভাযাত্রায় যুক্ত করা হয়েছে। শোভাযাত্রায় দৃশ্যমান করার জন্য এর আকৃতি বড় করা হয়েছে। পেঁচা, টেপা পুতুল, বাঘ আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদের নিয়ে মানুষ হেঁটে চলে বছরের প্রথম দিন। সঙ্গে ঢোল, করতাল, বাঁশি বাজিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এতে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদের কী আছে, জানি না। মানুষ তার প্রাণের টানে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। এ আয়োজনে যুক্তও হয় প্রাণের টানে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় যে অশুভকে বিনাশের প্রত্যাশা করা হয়– এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার আগে সেই অশুভ শক্তি উকিল নোটিশের লেফাফায় চড়ে নিজেই নিজেকে স্পষ্ট করেছে। চিহ্নিত শত্রুকে মোকাবিলা করা তো সহজ।

সুতরাং এখন সময় এসেছে সংস্কৃতিকর্মীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার। শুধু রমনা বটমূলে বৈশাখ বরণ বা চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাই নয়; এই আয়োজন হওয়া উচিত সারাদেশে, সাংগঠনিকভাবে। পহেলা বৈশাখ ঘিরে আগে পাড়া-মহল্লায় বৈশাখী মেলা হতো। সে মেলা আবার ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

সরকার যদি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সরকার বলে দাবি করে, তবে এবার সময় এসেছে তার প্রমাণ দেওয়ার। সংবিধানের বাঙালি জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রেই রয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়। এই সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্পষ্ট করার জন্যই ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষসহ নানা আন্দোলনের পথ পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছি আমরা। আজ যে চিহ্নিত শত্রু সেই জাতিসত্তাকে অস্বীকার করে; তাকে রাষ্ট্রের কোনো বিভাগ বা অংশ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় কিনা, সেটিই এবার দেখবে জনতা। জয় বাংলা।

সঙ্গীতা ইমাম: সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

আরও পড়ুন

×