ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থামবে না?

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থামবে না?
×

নড়াইলের লোহাগড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আমরা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনই বিস্মিত। উদ্বেগের কারণ এই- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২২ | ১৫:০২

নড়াইলের লোহাগড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আমরা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনই বিস্মিত। উদ্বেগের কারণ এই- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এ ধরনের হামলার অঘটন বেড়েই চলেছে। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুনঃপুন হুঁশিয়ারি এবং ক্ষেত্রবিশেষ গ্রেপ্তার ও মামলা সত্ত্বেও হামলার ঘটনা থামছে না। উদ্বেগের কারণ এটাও; সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর ধরন ও কারণ প্রায় অভিন্ন। শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি পোস্টের কারণে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তোলা হয় এবং তা ছড়িয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু যে ব্যক্তির সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট নিয়ে উত্তেজনা, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দক্ষই নন। আর এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো সদস্য সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার সাহসই পাবে না। এ ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ সামান্য যে, গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এভাবে সংঘবদ্ধ সহিংসতা চলে থাকে।

আমাদের বিস্ময়ের কারণ এই- সর্বশেষ হামলার ঘটনাটি ঘটেছে নড়াইলের মতো এলাকায়। আমরা জানি, দেশের যে কয়টি অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী; এই এলাকা তার অন্যতম। উদারপন্থি ও প্রগতিশীল রাজনীতির পীঠস্থান বলেও পরিচিত নড়াইল। বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এখানে রয়েছে ব্যাপক গণভিত্তি। তার পরও সেখানে তুচ্ছ অভিযোগে গুরুতর এই সাম্প্রদায়িকতার অঘটন ঘটল কেন! আমাদের প্রশ্ন- নড়াইলের জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করেছে। স্বীকার করতে হবে, নড়াইলে প্রশাসনের পক্ষে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। লোহাগড়া এলাকার সংসদ সদস্য এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ফেসবুকে নিজের বেদনা ও বিস্ময়ের কথা ভাগাভাগি করেছেন। কিন্তু আগের অঘটনগুলোর মতো নড়াইলেও 'রোগী মরে যাওয়ার পর ডাক্তার এসেছেন।'

সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে- ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তাকে শনিবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে তার পিতাকেও আটক করা হয়েছিল। এখানেও যে প্রশ্ন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তা হচ্ছে- উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ও হামলাকারীদের বদলে আক্রান্তদের আটক করার অর্থ কী? আমরা বরং দেখতে চাইব, আগের ঘটনাগুলোসহ নড়াইলে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ও হামলাকারীদেরই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মাশরাফি বিন মুর্তজার এই আহ্বানের সঙ্গে আমরা একমত যে, যদি কেউ ধর্ম অবমাননা করেও থাকে, তার প্রতিকারে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তার বদলে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায় এবং বেআইনি কর্মকাণ্ডে উস্কানি দেয় ও অংশগ্রহণ করে, তাদেরই বিচার হওয়া জরুরি। আমরা আশঙ্কা করি, প্রায় প্রতিটি ঘটনায় হামলাকারীদের বদলে আক্রান্তদের আটক ও হেনস্তা করার কারণেই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং নতুন নতুন এলাকা আক্রান্ত হচ্ছে। নড়াইলের ঘটনায় উস্কানিদাতা ও হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অন্যত্র এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থামাতে হলে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তাও জরুরি। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা একপক্ষীয় হামলার সময় দল-মত নির্বিশেষে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে যেভাবে মাঠে নামতে দেখা গেছে; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারও ঘাটতি স্পষ্ট। আমরা দেখতে চাইব, পারস্পরিক দোষারোপের বদলে রাজনৈতিক দলগুলো বিলম্বে হলেও মাঠে নেমেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়; সামাজিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখা জরুরি, এ ধরনের হামলায় জাতীয় সংহতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এও ভুলে যাওয়া চলবে না- বিষয়টি নিছক সংহতি ও ভাবমূর্তির নয়। এর সঙ্গে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি; তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে যদি একজন নাগরিক শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত হতে থাকেন, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?

আরও পড়ুন

×