ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

বিশ্বমঞ্চে জাতীয় স্বার্থ সামনে রাখার এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

বিশ্বমঞ্চে জাতীয় স্বার্থ সামনে রাখার এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
×

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এ মাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান

জুবায়ের বাবু

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৪ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫৫

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এ মাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার কথা বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর।
একজন সরকারপ্রধানের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া অবশ্যই নিয়মিত কূটনৈতিক কর্মসূচির অংশ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কেননা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুদীর্ঘ এক পারিবারিক ইতিহাস। প্রায় পাঁচ দশক আগে ১৯৮০ সালে একই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর মা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছেন ১৯৯১ সালে এবং আবার ২০০৫ সালে।
এবারের সফরে তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়নের সুযোগ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নতুন সরকারের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভাবনাও থাকবে তাঁর বক্তব্যে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি দেখাতে চাইবেন, বাংলাদেশ শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক অংশীদার হতে চায়।
শুনতে নতুন মনে হতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের জায়গাটি আসলে কতটা নতুন?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে প্রায় পাঁচ দশক পেছনে যেতে হয়।
১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যখন জাতিসংঘে বক্তব্য দেন, তখন পৃথিবী তেলের সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার কথা যেমন ছিল, তেমনি ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন।
তিনি তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিশ্বে সামরিক খাতে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, অথচ উন্নয়ন সহায়তা কমছে কেন। তাঁর কাছে ধনী ও দরিদ্র দেশের ব্যবধান শুধু অর্থনৈতিক বিষয় ছিল না, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল।
বাংলাদেশের জন্য তাঁর অগ্রাধিকার ছিল আরও স্পষ্ট। কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন এবং দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর কাছে বাজারে প্রবেশের সুযোগ, উন্নয়ন সহায়তা ও ঋণমুক্তির দাবিও তুলেছিলেন।
লক্ষণীয়, আত্মনির্ভরতার কথা বললেও তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন অস্বীকার করেননি। বরং বাংলাদেশের নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আরও ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার দাবিকে পাশাপাশি রেখেছিলেন। অর্থাৎ আত্মনির্ভরতা তাঁর বক্তব্যে বিশ্বের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ধারণা ছিল না। নিজের শক্তি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের স্বার্থের পক্ষে কথা বলার ধারণা ছিল।
খালেদা জিয়ার প্রথম জাতিসংঘ ভাষণের সময় বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
১৯৯১ সালে বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। সেই সময়ে তাঁর জাতিসংঘের বক্তব্যে বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক শাসন, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের পর পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য কমানো, নারীশিক্ষা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ছিল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ তখন নিজের ঘরের সমস্যাগুলোই নিয়ে গিয়েছিল বিশ্বমঞ্চে। এটাকে শুধু সাহায্য চাওয়ার কূটনীতি হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি দেশ তার নিজের অগ্রাধিকারগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ করে তুলছিল। কী চাইছে, কেন চাইছে, সেটিও তুলে ধরেছে স্পষ্টভাবে।
২০০৫ সালে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সময় সেই পরিসর আরও বড় হয়। জাতিসংঘের সংস্কার, সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার, উন্নয়ন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রম উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। বাংলাদেশ তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাছে দাবি জানাচ্ছে, আবার সেই ব্যবস্থায় নিজের দায়িত্বের কথাও বলছে।
বিশেষ করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালের ভাষণে খালেদা জিয়া জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের বড় পরিসরের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাছে নিজের স্বার্থ ও দাবির কথা বলছিল না, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সেই ব্যবস্থার একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেও নিজের ভূমিকা তুলে ধরছিল।
এই জায়গাতেই জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বক্তব্যের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। তা কোনো নির্দিষ্ট নীতির হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। বরং বাংলাদেশের নিজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি রাজনৈতিক প্রবণতা। নিজের স্বার্থের কথা বলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়া এখানে পরস্পরের বিপরীত নয়।
তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কথাটিকে সেই জায়গা থেকেই দেখার সুযোগ আছে।
শব্দবন্ধটি নতুন। কিন্তু এর পেছনের প্রশ্নটি পুরোনো।
আজকের বাংলাদেশ অবশ্য ১৯৮০ বা ১৯৯১ সালের বাংলাদেশ নয়। তখন দেশের প্রধান উদ্বেগ ছিল খাদ্য, দারিদ্র্য, উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো। এখন বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক বেশি জটিলভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনিয়োগ, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অভিবাসন কিংবা রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলার অর্থ শুধু নিজের দিকে তাকানো হতে পারে না।
বরং প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই পরস্পরনির্ভর পৃথিবীতে জাতীয় স্বার্থ কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। কার সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হবে, কোথায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, কোথায় সহযোগিতা দরকার, আর কোথায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি, জাতীয় স্বার্থের হিসাব এখন এসব প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই।
তিনি এমন এক সময়ে বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের কথা বলবেন, যখন সরকার দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর কথা তুলে ধরতে চাইছে। রোহিঙ্গা সংকটও থাকবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের মধ্যে। জাতিসংঘের মতো মঞ্চে এসব বিষয় কীভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেটিও দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি ইঙ্গিত দেবে।
এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় যোগ হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবার সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে আছেন। ফলে তারেক রহমানের বক্তব্য এমন একটি অধিবেশনে হবে, যেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি অন্য সময়ের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশি দৃশ্যমান।
তবে শেষ পর্যন্ত এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো পারিবারিক ইতিহাস নয়। বরং সেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে আজকের বাংলাদেশের অবস্থানটি বোঝা।
জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে আত্মনির্ভরতার কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেই আত্মনির্ভরতাকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে আলাদা করেননি। খালেদা জিয়া একদিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও নিজস্ব স্বার্থের কথা বলেছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতায় দেশের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। তারেক রহমান এখন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-কে সামনে রেখে সেই পুরোনো প্রশ্নের এক নতুন উত্তর দেওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।
 
জুবায়ের বাবু: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, নির্মাতা ও ব্রডকাস্টার।
 

আরও পড়ুন

×