ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

গালি নিয়ন্ত্রণ আইন!

গালি নিয়ন্ত্রণ আইন!
×

সাজ্জাদ সাব্বির

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৮

ফেসবুকে গালাগাল নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন করার কথা জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ। গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।

সামাজিক মাধ্যমে অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি যে একটি বাস্তব সমস্যা– তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন অন্য জায়গায়। গালি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র যেন সমালোচনা নিয়ন্ত্রণের আইন তৈরি না করে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন করে মানুষের ভাষা কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার সীমা খুব সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি, এমনকি অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগও রেখেছে।

অর্থাৎ সংবিধান গালিকে বিশেষ কোনো সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। আবার অপছন্দনীয়, রূঢ় বা কটু ভাষা ব্যবহার করলেই সেটিকে অপরাধ বানানোর সুযোগও সীমাহীন নয়।
গালি আসলে কী? আইনের ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ একজনের কাছে যে শব্দ অপমানজনক, অন্যজনের কাছে সেটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। কোনো অঞ্চলের কথ্য ভাষায় যে শব্দ স্বাভাবিক, অন্য অঞ্চলে সেটিই অশালীন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘চোর’, ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘ঘুষখোর’, ‘প্রতারক’, ‘স্বৈরাচারী’ বা ‘অযোগ্য’ বলা এবং কারও পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ এক ধরনের বক্তব্য নয়।

আইন যদি শুধু ‘অশালীন ভাষা’, ‘আপত্তিকর শব্দ’ এবং ‘কটু মন্তব্য’ নিষিদ্ধ করে, তাহলে বিপদ তৈরি হবে। কারণ এসব শব্দের আইনি সংজ্ঞা অস্পষ্ট। যুক্তরাজ্যের পুরোনো যোগাযোগ আইনে ‘গ্রসলি অফেনসিভ’ বা অত্যন্ত আপত্তিকর যোগাযোগের মতো শব্দ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এমন শব্দের সীমানা নির্ধারণ করা কতটা কঠিন। ব্রিটিশ আইন কমিশনও বলেছে, এ ধরনের শব্দের সঠিক অর্থ নির্ধারণ করা কঠিন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, একজন রাজনীতিবিদকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা এবং তাঁকে উদ্দেশ করে ব্যক্তিগত কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ এক জিনিস নয়। কোনো মন্ত্রীকে প্রতারক বলার সঙ্গে তাঁর পরিবারকে টেনে অপমান করার পার্থক্য আছে। ক্ষোভে কাউকে চোর বলা এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করার মধ্যেও পার্থক্য আছে। জনগণ ঠিক কতটা কটু কথা বললে সেটা গালি হবে; এই সীমারেখা কী হবে– এটা বড় প্রশ্ন।

তাই নতুন আইন হলে তার ভিত্তি কী হবে? ‘কোন শব্দ বলা হয়েছে’ এর ‘কী উদ্দেশ্যে, কোন পরিস্থিতিতে, কাকে লক্ষ্য করে, কী ধরনের ক্ষতি করার জন্য এবং কী মাত্রায় বলা হয়েছে’; এগুলো কীভাবে পরিমাপ করা হবে?

রাষ্ট্রের বড় বিপদ হবে এই আইনের রাজনৈতিক প্রয়োগ। আজ যে আইন দিয়ে অশ্লীল গালি বন্ধ করা হবে, আগামীকাল সেটির ব্যাখ্যা দিয়ে সরকারের সমালোচনাকে ‘অপমানজনক ভাষা’ বলা হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গচিত্র, কার্টুন, স্লোগান বা তীব্র ফেসবুক পোস্ট যদি একই আইনের আওতায় পড়ে, তাহলে আইনটি জনপরিসরকে পরিচ্ছন্ন করার বদলে সংকুচিত করবে।

গণতন্ত্রে অশালীনতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অস্পষ্টতা বিপজ্জনক।

ফেসবুকে গালি বন্ধ করতে আইন করা তুলনামূলক সহজ। কঠিন কাজ হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে গালি থামবে, কিন্তু সরকারের সমালোচনা থামবে না। নাগরিককে অপমান থেকে সুরক্ষা দেওয়া হবে, আবার নাগরিকের মুখও বন্ধ হবে না। সেই ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই এটি ভাষার শৃঙ্খলার আইন হবে। না হলে অচিরেই তা আরেকটি মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের আইন হয়ে উঠবে।

সাজ্জাদ সাব্বির: কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) 
sajjadsabbir24@gmail.com

আরও পড়ুন

×