ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মায়ের মধুর হাসি – মা দিবসের বিশেষ আয়োজন

অধিকারের প্রথম পাঠ

অধিকারের প্রথম পাঠ
×

মায়ের সঙ্গে ফারাহ্‌ কবির

ফারাহ্‌ কবির

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:০৭ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৬:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘মা’ কেবল একটি শব্দ নয়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিবিড় ছায়ায় আমরা বেড়ে উঠি, তার কোনো তুলনা নেই– এক অনন্ত মমতার মহাকাব্য। নাড়ির বাঁধনে বোনা সেই অকৃত্রিম স্নেহের ঋণ কি কখনও শোধ করা যায়? বিশ্ব মা দিবসের বিশেষ আয়োজনে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। গ্রন্থনা শাহেরীন আরাফাত
-----------------------------------------------------

মানুষের জীবনের প্রথম পাঠশালা হয় তাঁর ঘর আর প্রথম শিক্ষক হন মা। আমার ক্ষেত্রে এই ধ্রুব সত্যটি কেবল আক্ষরিক নয়, বরং আমার সমগ্র সত্তার ভিত্তি। আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, যে মানবিক মর্যাদা, নারীর অধিকার কিংবা জলবায়ু ন্যায়বিচারের কথা বলি–তার বীজ বপন করা হয়েছিল অনেক বছর আগে, আমার মা কামেলা খান মজলিসের মমতাময়ী সাহচর্য আর আদর্শিক শাসনের ছায়ায়।

তিনি কেবল একজন মমতাময়ী মা ছিলেন না, ছিলেন চেতনায় শানিত এক অগ্রপথিক। ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬-৫৭ মেয়াদে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ইতিহাসে প্রথম নারী সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর সেই লড়াকু মানসিকতা, প্রগতিশীল চিন্তা আর রাজনৈতিক সচেতনতা আমাদের পরিবারে মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছিল।

পেশাজীবনে মা ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকা। কামরুন্নেসা বালিকা স্কুল ঢাকা, চট্টগ্রাম স্কুল এবং শহীদ আনোয়ারা স্কুলে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। বাবার চাকরির সুবাদে লন্ডন, করাচিসহ নানা দেশ ও শহরে আমাদের শৈশব কেটেছে যাযাবরের মতো। এ অস্থিরতার মধ্যেও আমার শিক্ষার গতি কখনও রুদ্ধ হয়নি। কারণ মা ছিলেন এক অতন্দ্র প্রহরী। দর্শন, বাংলা এবং ইংরেজি–এই তিনটি বিষয়ে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল। তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমার ভেতরে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এবং মানবতার প্রতি আজীবন দায়বদ্ধতা তৈরি করেছিল।
আমার বেড়ে ওঠার পথে মায়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি মূর্ত হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালের ৯ মাসে। যখন চারদিকে বিভীষিকা আর অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার কারণে আমাদের স্কুলে যাওয়া ছিল অসম্ভব। সেই দুঃসময়েও মা ছিলেন আমার অদম্য শিক্ষক। ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ দিনগুলোয় বাইরে যখন গোলাবারুদের শব্দ, মা তখন শান্তভাবে আমাদের পাঠ্যবই আর গল্পের বই পড়ে শোনাতেন। সেই ৯ মাস তিনি বইয়ের মাধ্যমে বাইরের জগৎকে চেনার জানালাটা আমাদের জন্য খোলা রেখেছিলেন। তাঁর সেই স্থৈর্য আমাকে শিখিয়েছিল, পরিস্থিতির কাছে মাথা নত না করে নিজের লক্ষ্য ও আদর্শে অবিচল থেকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, সংবাদ পাঠক হিসেবে পথচলা এবং ১৯৭৬ সালে নাট্যচর্চায় যুক্ত হওয়ার পেছনে মায়ের সেই ধীরস্থির উৎসাহ কাজ করেছে সবসময়। বাবা সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে বিশ্বের প্রতি কৌতূহল জন্মেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিশ্বে নিজের অবস্থান খুঁজে নেওয়ার নৈতিক শক্তি ও সাহসের বাতিঘর ছিলেন মা। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন প্রশ্ন করতে, ভাবতে এবং মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে।

আজ যখন দেশের প্রান্তিক মানুষসহ নারীর অধিকার ও সামাজিক সমতার কথা বলি, প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করি– মা-ই আমার ভেতরে সেই সাহসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। মা দিবসে আমার মায়ের সেই জ্ঞানালোকিত রূপটিই বারবার মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন আমার জীবনের প্রথম বিদ্যালয় আর আমি আজও তাঁরই এক আজীবন শিক্ষার্থী।

আরও পড়ুন

×