স ম সা ম য়ি ক
সমন্বয়হীনতার দুষ্টচক্র সদিচ্ছা ও জবাবদিহির সংকট
অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার
অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আমরা প্রতিনিয়ত ‘সমন্বয়হীনতা’র আক্ষেপ শুনি। একটি কার্যকর ও একীভূত সেবাব্যবস্থার অভাবে ভুক্তভোগীরা আজও পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, জরুরি হেল্পলাইনের কথাই ধরা যাক। এক যুগের বেশি সময় ধরে কাঠখড় পুড়িয়ে ‘১০৯’ নম্বরটি মানুষের কাছে পরিচিত করার পর, এখন কেন এর সঙ্গে ‘১৬৬’, ‘৯০৯’ বা ‘৯৯৯’-এর মতো একাধিক নম্বরের গোলকধাঁধায় মানুষকে ফেলা হচ্ছে? বিপদের মুহূর্তে একজন নারীর জন্য একটি একক, সমন্বিত ও কার্যকর হটলাইন সর্বোচ্চ যৌক্তিক দাবি।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা ঘোচাতে এবং ‘একই ছাদের নিচে সব সেবা’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২৪ বছর ধরে তিলে তিলে যে বহুমাত্রিক কর্মসূচি বা ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (ওসিসি) গড়ে তোলা হয়েছিল, আজ তা বন্ধের পাঁয়তারা চলছে। ‘সক্ষমতা নেই’ বা ‘অর্থ নেই’–এমন খোঁড়া যুক্তিতে নারীর এ সুরক্ষাবলয়টি ভেঙে ফেলার চেষ্টা কতটা মানবিক? রাষ্ট্রের অন্যান্য খাতে অর্থের জোগান থাকলেও কেবল নারীর নিরাপত্তার বেলায় কেন এই চিরন্তন ‘নাই’ শব্দটির প্রতিধ্বনি শোনা যায়?
সেবা নিতে গিয়ে থানা বা হাসপাতালে নারীর তিক্ত অভিজ্ঞতার গল্প আজও দীর্ঘ। হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেবল সীমানা বা ‘জুরিসডিকশন’-এর অজুহাতে ভুক্তভোগী নারীকে এক থানা থেকে অন্য থানায় ফুটবলের মতো চালাচালি করার অমানবিক চর্চা এখনও বিদ্যমান। যুগ যুগ ধরে সংবেদনশীলতা বাড়ানোর নামে কেবল ‘ট্রেনিং’ করানো হয়, অথচ কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। এখন সময় এসেছে এই গালভরা প্রশিক্ষণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপিএর গবেষণা বলছে, দেশের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ ‘১০৯’ হটলাইন সম্পর্কে জানে। ডিজিটাল বাংলাদেশের এই যুগে যেখানে সবার হাতে স্মার্টফোন, সেখানে সচেতনতার এই দৈন্যদশা আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রমাণ।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এখন একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী রয়েছেন; এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এ কাঠামোগত সুবিধা যদি সেবাপ্রাপ্তি ও সমন্বয়ের করুণ চিত্র বদলাতে না পারে, তবে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
লেখক: মানবাধিকার আইনজীবী; সদস্য, নারীপক্ষ
- বিষয় :
- নারী
- নারী নির্যাতন
- নারী নির্যাতন প্রতিরোধ