ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স ম সা ম য়ি ক

নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ বাড়ছে

নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ বাড়ছে
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বিয়ের অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনের জন্য নিমন্ত্রণ করে দুই নারী নৃত্যশিল্পীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা আমাদের আবারও একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে–একজন নারী তাঁর পেশাগত পরিচয়ের কারণে কতটা নিরাপদ? 

ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। এর ভয়াবহতা শুধু ধর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রতারণার মাধ্যমে পেশাগত কাজের সুযোগের কথা বলে নারীদের এমন একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের চলাচল ও প্রতিরোধের সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ তাদের পেশাগত কাজের প্রয়োজনীয়তাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

আমাদের সমাজে কিছু পেশাকে এখনও সামাজিক মর্যাদার প্রচলিত ধারণা দিয়ে বিচার করা হয়। নৃত্য, অভিনয় কিংবা বিনোদনজগতের সঙ্গে যুক্ত নারীদের ক্ষেত্রেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি কমবেশি বিদ্যমান। এর ফলে কখনও কখনও তাদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতাকে অন্য নারীর তুলনায় ভিন্নভাবে দেখা হয়, ভুক্তভোগীর পেশা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, এমনকি পরোক্ষভাবে তাঁকে দায়ী করার প্রবণতাও দেখা যায়। অথচ একজন নারী যে পেশাতে থাকুন না কেন, তাঁর মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার সমান। পেশা কোনো নারীর অধিকারকে ছোট করে না। বরং নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার অধিকার তাঁর নাগরিক ও মানবাধিকারের অংশ।

এ ঘটনাটি আমাদের আরও ভাবতে বাধ্য করে– নারী যখন কাজের প্রয়োজনে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যান, অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করেন কিংবা কাজের প্রস্তাব গ্রহণ করেন, তখন তাদের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর কোনো কাঠামো কি আমাদের আছে? বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক ও চুক্তিভিত্তিক পেশায় যুক্ত নারীর জন্য নিরাপদ যোগাযোগ, কাজের স্থান যাচাই, জরুরি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর–এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়; এমন পরিবেশ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যেখানে মানুষ নিরাপদে কাজ করতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার পাশাপাশি তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও পেশাদার, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পেশাগত পরিচয় যেন তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক বিচারের কারণ না হয়। তারা নৃত্যশিল্পী–এটাই তাদের কাজ। তাদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার কোনো ব্যাখ্যা বা দায় এর মধ্যে খোঁজা যায় না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে স্পষ্ট–একজন নারী যে পেশাতেই যুক্ত থাকুন, তাঁর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার সমান।

তিতাস নদীর এ ঘটনা তাই শুধু একটি ফৌজদারি মামলার বিষয় নয়। এটি আমাদের সমাজে নারীর কাজের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা বাস্তব–সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো নারী পেশাগত কাজের জন্য বাড়ির বাইরে বের হলে তাঁকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে না হয়। নারীর কর্মক্ষেত্র যত বৈচিত্র্যময় হবে, তাঁর নিরাপদে কাজ করার অধিকারও ততটাই নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: মানবাধিকারকর্মী; জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র

আরও পড়ুন

×