ঋণের কিস্তিতে বন্দি অভিবাসী নারী
শিল্পকর্ম:: ইভা আরমিজেন
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৪ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাত ১টা পেরিয়েছে। সৌদি আরবের এক বাড়িতে কাজের চাপ এ সময়ে একটু কমে। তখনই ফোন আসে টাঙ্গাইলের এক গ্রামে। সেখানে ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। ওপাশে তাসলিমা (ছদ্মনাম)। গলা নামিয়ে কথা বলেন। কাঁদেন। শেষে বলেন, ‘দোয়া কইরো, আর কয়টা মাস!’
এই ‘আর কয়টা মাস’ গড়াতে গড়াতে প্রায় দুই বছর। এর মধ্যে তিনি মার খেয়েছেন। বেতন ঠিকমতো পাননি। পেট ভরে খেতে পাননি। যৌন নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন। তবু ফিরছেন না। কেন ফিরছেন না, তা তিনি জানেন। পরিবারও জানে। তাসলিমা সবার বড় সন্তান। বাবা দিনমজুর ছিলেন। এখন শরীর আর চলে না। ভিটেটুকু ছাড়া কোনো জমি নেই। স্থানীয় সংস্থার দুটি কিস্তি আগে থেকেই চলছিল। বিদেশ যাওয়ার আগে তুলেছেন আরও একটি। সঙ্গে ধারও করেছেন। সেসব শোধ হয়নি। খালি হাতে ফিরলে ঋণ তো নামবেই না, উল্টো ঘাড়ে চেপে বসবে। তাই মারধর সয়েও থেকে যাওয়া।
শ্রম আইনের ভাষায় এর নাম ঋণবন্ধন। সোজা বাংলায়, ঋণের দাসত্ব।
যে খরচ থাকার কথা নয়
বাংলাদেশের নারী শ্রমিকের সৌদি আরবে যাওয়ার কথা বিনা খরচে। সব খরচ দেবেন নিয়োগকর্তা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ অঙ্কটাও বেঁধে দিয়েছে। একজন বাংলাদেশি গৃহকর্মী নিতে নিয়োগকর্তা খরচ করেন সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৭৫০ রিয়াল, টাকায় পৌনে চার লাখ টাকার কাছাকাছি। ফিলিপাইনের কর্মীর জন্য এই অঙ্ক ১৪ হাজার ৭০০ রিয়াল, শ্রীলঙ্কার কর্মীর জন্য ১৩ হাজার ৮০০। তালিকার নিচের দিকে বাংলাদেশের নারী। সস্তা দামে আনা মানুষের সঙ্গে আচরণও সস্তা হয়।
তবু খালি পকেটে কেউ যেতে পারেন না। কেরানীগঞ্জের শাহিনা দেওয়ান কয়েক বছর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে সংগঠক ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অফিসে কোনো টাকা লাগে না। দালালের (সাব এজেন্ট) কাছে গেলে তার খরচ দেওয়া লাগবে। দালাল ছাড়া গেলে টাকাটা ট্রাভেল অফিসের লোকেরা খাইয়া ফেলে।’ মেডিকেল, প্রশিক্ষণ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স–প্রতিটি ধাপে টাকা। শাহিনার হিসাবে, ‘৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধইরা রাখেন।’
অঙ্কটা শহরের চোখে হয়তো বড় নয়। কিন্তু যিনি দিচ্ছেন, হাতে টাকা নেই বলে তো তিনি দেশ ছাড়ছেন। বাদাবন সংঘের ২০২৫ সালের সাত জেলার গবেষণা বলছে, বিদেশে যাওয়া নারীর ২৭ দশমিক ৬ শতাংশের কোনো আয়ের উৎস ছিল না। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) আইনি সহায়তা নিতে আসা ১১৪ জন কর্মীর অভিজ্ঞতা ঘেঁটে দেখেছে, সৌদিগামীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে আইনি সীমার দ্বিগুণ টাকা।
সেই টাকা আসে কিস্তি থেকে। ক্ষুদ্রঋণে সুদের সর্বোচ্চ হার ২৪ শতাংশে বাঁধা। ফ্ল্যাট পদ্ধতিতে আসল কমলেও সুদ বসে পুরো আসলের ওপর। তাতে কার্যকর সুদ গিয়ে ঠেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে। মহাজনের কাছে গেলে তো কথাই নেই। কেউ গহনা বন্ধক রাখেন, কেউ শেষ জমিটুকু বিক্রি করে দেন। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে নারী অভিবাসীর জন্য আলাদা ঋণ আছে; তবে কাগজে। বাস্তবে ব্যাংক এই নারীদের ঋণ দেয় না। শাহিনা দেওয়ানের নিজের ইউনিয়নে প্রবাসী নারী আছেন ৬০০-এর মতো। জানান, তাদের সবার কিস্তি নেওয়া আছে। সবাই ঋণগ্রস্ত।
চাকরি ফুরায়, ঋণ ফুরায় না
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণা বলছে, অভিবাসী নারীরা আয়ের ৯০ শতাংশই দেশে পাঠান। পুরুষ পাঠান অর্ধেক। সেই টাকার প্রথম ভাগ যায় কিস্তিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বিদেশ যাওয়ার খরচ উঠতে গড়ে ১৭ মাসের বেশি লাগে। অথচ ওকাপের গবেষণায় প্রকাশিত তথ্যমতে, ৩৬ শতাংশ কর্মী তিন মাসের মধ্যে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) জরিপে ২৩ শতাংশ নারী বছর না ঘুরতেই ফিরেছেন।
চুক্তিপত্রের ছবিটা আরও করুণ। ওকাপের সে গবেষণায় একজন নারীও দেশ ছাড়ার আগে চাকরির চুক্তিপত্র হাতে পাননি। কাগজ না থাকলে কম বেতনের প্রতিবাদ চলে না। দেশে ফিরে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার ভিত্তিও থাকে না। থেকে যায় শুধু ঋণ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার আগে নারী কর্মীকে কেবল সাধারণ ধারণা দিলে চলবে না; গন্তব্য দেশের ভাষা, সুনির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা এবং সেখানকার শ্রম আইন ও অধিকার সম্পর্কে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যথাযথ দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের নারীদের গৃহকর্মের বেড়াজাল থেকে বের করে নার্সিং, কেয়ারগিভিং (পরিচর্যা), এমনকি ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দূতাবাস ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সহায়তায় যদি এমন কোনো ব্যবস্থা করা যায়; যেখানে নারী কর্মীরা দিনে কাজ শেষে রাতে আলাদা কোনো সুরক্ষিত হোস্টেল বা সেইফ হোমে অবস্থান করবেন, তবে তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।’
হিসাব কষা নীরবতা
ঋণের সবচেয়ে নিষ্ঠুর কাজ মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া। তাসলিমার নীরবতা ভয়ের নয়, হিসাবের। মুখ খুললে চাকরি যাবে। চাকরি গেলে ফিরতে হবে। ফিরলে কিস্তির লোক দরজায় দাঁড়াবে। এই অঙ্ক তাঁকে কেউ শেখায়নি। জীবন শিখিয়েছে। এ নীরবতা কাফালা ব্যবস্থাকে পাহারা দেয়। এখানে কর্মীর আইনি অস্তিত্ব বাঁধা থাকে একজন মালিকের সঙ্গে। মালিক না চাইলে কাজ বদলানো যায় না, দেশে ফেরাও কঠিন। পাসপোর্ট থাকে মালিকের হাতে। ঘরের ভেতরের কাজ, তাই সহকর্মী নেই, সাক্ষীও নেই।
বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের (বিএনএসকে) পরিচালক এস কে মজিবুল হক জানান, অধিকাংশ নারীকে দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা খাটতে হয়। ফিলিপাইনের নারীরা এর প্রতিবাদ করেন। বাংলাদেশের নারীরা পারেন না। কেন পারেন না, সে ব্যাখ্যা আর লাগে না। যার মাথায় কিস্তি, প্রতিবাদ তাঁর গলায় এসে আটকে যায়।
ফেরা মানে মুক্তি নয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজ গ্রামে সালমা (ছদ্মনাম) ফিরেছেন গত বছর। যৌতুক দিতে না পারায় সংসার ভেঙেছিল। মেয়েকে নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে চলছিলেন কিস্তি নেওয়া টাকায়। তারপর আবার কিস্তি তুলে সৌদি আরব। তিন বছর কাটিয়েছেন তাসলিমার মতো দুর্বিষহ অবস্থায়। সে কথা মুখে আনতে চান না। কারণ জানতে চাইলে বলেন পরিবার আর সমাজের কথা।
সমাজের চেহারাটা বিলসের জরিপে ধরা পড়ে। চট্টগ্রাম, যশোর আর ফরিদপুরের ৩২৩ জন ফেরত আসা নারীর ৩৮ শতাংশকে সমাজ দেখে ‘চরিত্রহীন’ হিসেবে। ওই গবেষণায় এক অভিবাসী নারীর কথা বলা হয়, যিনি জর্ডানে বন্দিদশা থেকে বাঁচতে তিনতলার ছাদ থেকে পাশের ভবনে লাফ দিয়েছিলেন। পা ভেঙে, স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা নিয়ে দেশে ফেরেন। স্বামী তাঁকে ঘরে তোলেননি। বলেছেন, ‘অন্য কোনো মেয়ে হলে লজ্জায় মরে যেত, তুই কেন বেঁচে আছিস?’
এই অপমানের নিচে চাপা পড়ে থাকে টাকার হিসাব। বিলসের জরিপে ৬১ শতাংশ নারী এখনও ঋণ টানছেন। ৬০ শতাংশ বেকার। ৭৫ শতাংশের কোনো সঞ্চয় নেই। প্রতি তিনজনে একজনের অবস্থা বিদেশ যাওয়ার আগের চেয়েও খারাপ। ৫৫ শতাংশ শরীরে অসুখ নিয়ে ফিরেছেন। চিকিৎসায় টাকা লাগে। টাকা নেই। তাই আবার ঋণ। চাকাটা ঘোরে একই বৃত্তে।
রাষ্ট্রের খাতায় ফাঁকা ঘর
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার। এই টাকায় রিজার্ভ ভরে, বাজেটের খাতা মেলে। অথচ কতজন নারী ফিরলেন, কী নিয়ে ফিরলেন, সেই হিসাব রাষ্ট্রের কাছে নেই। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, আট বছরে (২০১৬-২০২৩) লাশ হয়ে ফিরেছেন ৭৯৯ জন নারী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশের মিশনগুলো আইনি সহায়তা দিয়েছে ৩৯৫ জন কর্মীকে। তাদের মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সেফ হোম মোটে চারটি।
ফলটাও চোখে পড়ছে। বিএমইটি’র তথ্যমতে, ২০২২ সালে বিদেশে গিয়েছিলেন এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৬৬ জন নারী। ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন। তিন বছরে কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সংখ্যাটা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু ৯০ শতাংশের বেশি নারী গেছেন সেই দুই দেশেই–সৌদি আরব আর জর্ডানে; যেখানে নিপীড়ন সবচেয়ে বেশি।
ব্র্যাকের মো. হারুন-অর-রশীদ মনে করিয়ে দেন, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দরকার হলে কর্মী পাঠানো বন্ধ করে নাগরিকের সুরক্ষা আদায় করেছে। বাংলাদেশ সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।
চক্রটা ভাঙা যায়
সমস্যা জটিল, কিন্তু সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথম কাজ শূন্য খরচের নিয়মকে কাগজ থেকে বাস্তবে পরিণত করা। বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়ার সময় প্রত্যেক নারীকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করতে হবে, কাউকে টাকা দিয়েছেন কিনা। উত্তর লিখে রাখতে হবে। মেডিকেল থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, সব খরচ মেটাবে এজেন্সি নিজে। টাকা নেওয়ার প্রমাণ মিললে লাইসেন্স স্থগিত, জামানত থেকে সেই টাকা ফেরত।
দ্বিতীয়ত, বাংলায় লেখা চুক্তিপত্র যাত্রার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে হাতে না দিয়ে কাউকে পাঠানো যাবে না।
তৃতীয়ত, গ্রামের দালালকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সাব-এজেন্ট নিবন্ধনের বিধান হয়েছে, প্রয়োগ হয়নি।
চতুর্থত, জোর করে ফেরত পাঠানো নারীদের ঋণ বা কিস্তি পুনঃতপশিল ও সুদ মওকুফের জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি নির্দেশনা দিতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ যেন এই নারীদের হাতে পৌঁছায়, সে জন্য জামানতের শর্ত শিথিল করা দরকার।
পঞ্চমত, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর বেতন ব্যাংক বা ডিজিটাল ওয়ালেটে দেওয়া বাধ্যতামূলক। দূতাবাস এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। বেতন না ঢুকলে সেটিই হবে অভিযোগের কাগুজে প্রমাণ। ফেরত পাঠানোর আগে নারীর লিখিত অভিযোগ নিতে হবে, বকেয়া বেতন আদায় করতে হবে। বারবার অভিযোগ ওঠা নিয়োগকর্তাদের কালো তালিকায় তুলে সেখানে নারী কর্মীদের পাঠানো বন্ধ করতে হবে। ফেরার মুহূর্তে বিমানবন্দরে নাম, জেলা, গন্তব্য, বেতন আর ঋণের তথ্য নথিভুক্ত হলে পুনর্বাসন আর অনুমানে চলবে না।
সর্বোপরি, সমাজের চোখটা বদলাতে হবে আর সেই কাজ রাষ্ট্রকে শুরু করতে হবে। রাষ্ট্র যদি শ্রমিকদের সম্মান দেয়, তাহলে সমাজও তা অনুসরণ করবে। যে নারী ঘাম বেচে রেমিট্যান্স পাঠান, তাঁকে ফেরার পর চরিত্রহীন বলা হলে সেটি শুধু তাঁর অপমান নয়; ওই অপমানই পরের মেয়েটিকে মুখ বন্ধ রাখতে শেখায়।
- বিষয় :
- নারী
- শাহেরীন আরাফাত
- অভিবাসী নারী
- অভিবাসী