ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি– ড. নূরজাহান সরকার

অরণ্যের ডাকে সাড়া দেওয়া এক অগ্রপথিক

অরণ্যের ডাকে সাড়া দেওয়া এক অগ্রপথিক
×

ড. নূরজাহান সরকার

আশিকুর রহমান সমী

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির যে অমোঘ নিয়মের পাঠ তিনি আজীবন দিয়েছেন, সেই নিয়মের কাছে যেন চিরতরে সমর্পিত হলেন তিনি। ১৭ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী বন্যপ্রাণীবিদ অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকার। ৭৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এ মহীয়সী নারী। ছয় দশক ধরে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তা এ দেশের বিজ্ঞান ও গবেষণার ইতিহাসে এক অমলীন অধ্যায়।

১৯৪৮ সাল। ঝালকাঠি জেলার নলছিটির ভেরনবাড়িয়া গ্রামের পঞ্চায়েত বাড়িতে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকে অসম্ভব মেধাবী নূরজাহান পড়াশোনার প্রতি ছিলেন প্রবল অনুরাগী। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কেবল ভালো ফল নয়; বরং তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের শত শিকল ভেঙে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

সে এক অন্য রকম সময়। ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে উঠলে যেখানে মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়াটা সমাজের অলিখিত নিয়ম ছিল, সেখানে নূরজাহান স্বপ্ন দেখেছিলেন অনন্ত জ্ঞানান্বেষণের। এই দুর্গম যাত্রায় সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর মা। মায়ের একরোখা জেদ আর শর্ত ছিল–এমএসসি ডিগ্রি অর্জনের আগে বিয়ে দেওয়া যাবে না। 

উচ্চশিক্ষার স্তরে এসে নূরজাহান সরকার বেছে নিলেন বন্যপ্রাণিবিদ্যা। সিদ্ধান্তটি কেবল কঠিন ছিল না, ছিল তৎকালীন সমাজের চোখে প্রায় ‘অকল্পনীয়’। একজন বাঙালি নারী বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবেন, দুর্গম পাহাড়-নদী পেরিয়ে মাঠে-ঘাটে বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা করবেন–এটি মেনে নিতে পারছিলেন না অনেকে। এমনকি বাংলাদেশে বন্যপ্রাণিবিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক ড. কাজী জাকের হোসেনও শুরুতে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। নূরজাহান পিছিয়ে পড়ার মানুষ নন। বন্যপ্রাণী নিয়ে পড়ার জেদে তিনি দিনের পর দিন শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যান। একপর্যায়ে তাঁর একাগ্রতা যাচাই করার জন্য ইংরেজিতে দুই পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ লিখতে বলা হয়; যেখানে তাঁকে ব্যাখ্যা করতে হবে, কেন তিনি বন্যপ্রাণী নিয়ে পড়তে চান। নূরজাহান তাঁর স্বপ্ন, প্রকৃতির প্রতি নাড়ির টান আর বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসার কথা উজাড় করে লিখলেন সেই দুই পৃষ্ঠায়।

শিক্ষক তাঁকে শেষ প্রশ্ন করলেন–‘বন-জঙ্গলে মাসের পর মাস থাকতে পারবেন তো?’ নূরজাহানের উত্তর ছিল অবিচল ও দৃঢ়। গ্রামীণ পরিবেশে পাখির ডাক শুনে আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা মেয়েটির কাছে প্রকৃতি কখনোই ভয়ের কিছু ছিল না; বরং তা ছিল এক পরম আশ্রয়ের নাম। শিক্ষকের আর বুঝতে বাকি রইল না, এই মেয়ে ইতিহাস গড়তে এসেছে। শুরু হলো বাংলাদেশের প্রথম নারী বন্যপ্রাণীবিদের এক ঐতিহাসিক পথচলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের রমনা পার্ক ও বলধা গার্ডেন থেকে যে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছিল, কালক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবনের গহিন অরণ্য থেকে বান্দরবানের পাহাড়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। মাথায় হ্যাট আর গায়ে সাদা অ্যাপ্রোন জড়িয়ে বনের পর বন চষে বেড়িয়েছেন তিনি।

বন্যপ্রাণী গবেষণা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা ছিল না, ছিল যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাঠপর্যায়ে গবেষণার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি নিরলসভাবে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছেন। জ্ঞানের পিপাসা তাঁকে নিয়ে যায় সুদূর ফ্রান্সে। ১৯৭৪ সালে ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যের খবর সে সময় ফ্রান্সের সংবাদপত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ড. নূরজাহান। শুরু হয় আরেক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি কেবল পড়াননি, হাতে ধরে তৈরি করেছেন বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য গবেষকদের একটি আস্ত নতুন প্রজন্ম। দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য জার্নালে তাঁর অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন বন্যপ্রাণীবিষয়ক একাধিক বই। দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন’সহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন।

অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকারের জীবন আমাদের সামনে একটি ধ্রুব সত্য তুলে ধরে–বিজ্ঞান ও প্রকৃতির জগতে নারীর বিচরণে প্রাকৃতিকভাবে কোনো বাধা নেই; বাধাগুলো কেবল সমাজের চাপিয়ে দেওয়া। মেধা, অদম্য সাহস আর প্রকৃতির প্রতি নিরেট ভালোবাসা দিয়ে তিনি সেই কৃত্রিম বাধাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

তিনি একবার বলেছিলেন, ‘মেয়েদের আর মায়েদের মধ্যে থাকে এক অপূর্ব প্রাণশক্তি; যা সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।’ আজ তাঁর অনন্ত যাত্রার দিনে কথাটি যেন নতুন করে কানে বাজছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বন বিভাগ ও মাঠপর্যায়ের সংরক্ষণ কার্যক্রমে নারীরা আজ অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। যদিও বহু সংকট আর সীমাবদ্ধতা এখনও বিদ্যমান।

বাংলাদেশের বন, জলাভূমি, বন্যপ্রাণী আর অগণিত শিক্ষার্থীর স্মৃতির মণিকোঠায় অধ্যাপক ড. নূরজাহান সরকার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। এই বিদুষী অরণ্যচারীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাবি

আরও পড়ুন

×