ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

অষ্টম শ্রেণি পাস প্রার্থী স্কুল কমিটিতে ‘স্নাতক’

অষ্টম শ্রেণি পাস প্রার্থী স্কুল কমিটিতে ‘স্নাতক’

.

 আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৪ | ০০:১১ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৪ | ০৮:৪৪

জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর নাম আতিকুর রহমান লেবু। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদে আসীন হওয়ার সময় ‘লেবু মিয়া’ নামে ব্যবহার করেছেন স্নাতক (অনার্স) পাসের সনদ। একই ব্যক্তি মাদারগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার সময় হলফনামায় সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করেছেন অষ্টম শ্রেণি পাস। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযোজন করেছেন সনদ ও বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র।

উপজেলার কাতলামারী গ্রামের মৃত এফাজ উদ্দিন সরকারের ছেলে আতিকুর রহমান লেবু। তিনি পেশায় দলিল লেখক। তাঁর বিরুদ্ধে জাল সনদ নেওয়ার লিখিত অভিযোগ করেছেন এক ব্যক্তি। তিনি নিজেও দুই নামে সনদ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে জানা গেছে, আতিকুর রহমান ২০২১ সালের ৭ জুন থেকে ‘লেবু মিয়া’ নাম ব্যবহার করে নিশ্চিন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ জন্য ‘প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দাখিল করেন। 

এতে ১৯৯০ সালে এসএসসি, ১৯৯২ সালে এইচএসসি ও ১৯৯৬ সালে পাস করা ‘বিএ অনার্স’-এর সনদে তাঁর নাম উল্লেখ রয়েছে ‘লেবু মিয়া’। এদিকে আগামী ২৯ মে অনুষ্ঠেয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, সেখানে নাম উল্লেখ করেছেন আতিকুর রহমান লেবু। সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করেছেন অষ্টম শ্রেণি পাস। সঙ্গে সংযোজন করেছেন মোসলেমাবাদ এলাকার ‘ইসলামাবাদ ওয়াছিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়’ থেকে অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ ও প্রত্যয়নপত্র।

এ বিষয়ে উপজেলার গুনারীতলা গ্রামের সাখাওয়াত জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, চেয়ারম্যান প্রার্থী আতিকুর রহমান লেবুর সংগ্রহ করা ‘লেবু মিয়া’ নামের সব সনদপত্র ভুয়া। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তালিকায় ‘প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ নামে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই।

ঢাকায় ‘প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি’ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে বলে জানান ইউজিসির জনসংযোগ ও তথ্য অধিকার বিভাগের পরিচালক ড. এ কে এম শামসুল আরেফিন। তিনি বলেন,  ‘প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ নামে দেশে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রোগ্রাম চালুর অনুমতি নেই। এ ধরনের সনদ স্বীকৃত শিক্ষা বোর্ড ইস্যু করে। এ ব্যাপারে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। অভিযোগটি জনস্বার্থে করেছেন জানিয়ে সাখাওয়াত বলেন, আতিকুর রহমান অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্স পাসের ‘ভুয়া সার্টিফিকেট’ ব্যবহার করেছেন। স্কুল কমিটির সভাপতি হয়ে আত্মসাৎ করেছেন সরকারি বরাদ্দের টাকা। সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি এর প্রতিকার চান।
মাদারগঞ্জে প্রায় ২০০টি স্কুল আছে জানিয়ে শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুর রহামান বেলাল বলেন, কখন কোন স্কুলের কমিটি হয়, তা মনে রাখা সম্ভব না। তবে সনদ জাল প্রমাণিত হলে শিক্ষা কমিটির সভায় তাঁকে স্কুল কমিটির সভাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করা হবে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন খান বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি অনুমোদন ও সভাপতি নির্বাচিত হয় উপজেলা শিক্ষা কমিটি থেকে। সভাপতির জাল সনদের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে আতিকুর রহমান লেবুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, ‘মানুষের কি একাধিক নাম থাকতে পারে না? এটা দোষের কী?’ সনদের বিষয়ে কোনো সদুত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই নামেই আমার সনদ আছে। তাতে আপনার সমস্যা কী?’ এর পর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সুমী আক্তার বলেন, আতিকুর রহমান প্রার্থী হওয়ার সময় হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস উল্লেখ করে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। স্কুল কমিটির সভাপতি নির্বাচনের সময় ভুয়া সনদ দিলে সে ব্যপারে ব্যবস্থা নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
 

আরও পড়ুন

×