গহনায় বোনা নস্টালজিয়া
অগাথা অন্যা মণ্ডল
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছিল এক ধূসর অধ্যায়। বিষণ্নতার ভারী মেঘ যখন চারপাশ ঘিরে ধরেছিল, তখন মুক্তির পথ হিসেবে শিল্পের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অগাথা অন্যা মণ্ডল। মন ভালো করার তাগিদ থেকে শুরু করেছিলেন পেপার ক্র্যাফটিং। প্রিয় সিনেমার সংলাপ কিংবা গানের লাইন ক্যালিগ্রাফি করে বানাতেন বুকমার্কসহ নানা শৌখিন জিনিস।
বিপত্তি বাধল অন্য জায়গায়। কাজ করতে গিয়ে জমতে শুরু করল প্রচুর কাগজের বর্জ্য, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং ফেলা দেওয়াও বেশ ঝামেলার। পরিবেশ সচেতন অন্যার মনে হলো, এমন কিছু করতে হবে; যার উপযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী। এই ভাবনা থেকে পেপার ক্র্যাফটিং থেকে সরে এসে ২০১৭ সালে তিনি পা রাখেন জুয়েলারি বা গহনা তৈরির জগতে। জন্ম নেয় তাঁর স্বপ্নের উদ্যোগ–‘কাদম্বরী’। এরপরের গল্পটা কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মোটিফ, পুরোনো দিনের গহনার স্মৃতি আর নস্টালজিয়াকে নিজের নকশায় নতুন রূপে তুলে ধরছেন অন্যা। তাঁর কাছে গহনা কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়; বরং প্রতিটি গহনা একেকটি অব্যক্ত গল্পের ধারক।
অন্যার গহনা-প্রেমের শিকড় লুকিয়ে রয়েছে তাঁর শৈশবে। তাঁর দাদু ছিলেন অ্যান্টিক বা প্রাচীন জিনিসের নিবিষ্ট সংগ্রাহক। পুরোনো দামি ঘড়ি, ভিনদেশি মুদ্রা, দুর্লভ জেমস্টোনসহ নানা ঐতিহাসিক জিনিসের জগৎ দেখে বড় হয়েছেন তিনি। সেখান থেকে পুরোনো জিনিসের প্রতি তাঁর এক দুর্নিবার আকর্ষণ জন্মে। অন্যা বুঝতে শেখেন, একটি পুরোনো জিনিসের মূল্য শুধু তার বস্তুগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার গায়ে লেগে থাকা সময়ের গল্পগুলো তাকে অমূল্য করে তোলে। এই উপলব্ধি তাঁর ডিজাইনের দর্শনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। সে জন্যে গহনা তৈরির সময় তিনি শুধু বাহ্যিক নকশার দিকে তাকান না, বরং গহনাটির অন্তর্নিহিত গল্পকেও সমান গুরুত্ব দেন।
উদ্যোক্তা হিসেবে অন্যার পথচলার শুরুটা হয়েছিল মাত্র ছয় হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে। সেই সামান্য টাকা হাতে নিয়ে চকবাজারের অলিগলি ঘুরে গহনা তৈরির উপকরণ কিনে এনেছিলেন তিনি। কিনে আনা ফড়িংয়ের চার্ম আর কালো সুতো দিয়ে প্রথম যে চোকারটি বানিয়েছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন ‘মনফড়িং’। এরপর সেই চার্ম দিয়ে তৈরি করেন নূপুর, আর লাল-কালো সিডবিডস দিয়ে কানের দুল। বন্ধুদের আড্ডায় সেই গহনা ব্যাপক সাড়া ফেলে, যা অন্যাকে বড় পরিসরে ভাবতে সাহস জোগায়।
অন্যা বলেন, ‘‘ছোট ছোট জিনিসের প্রতি আমার বরাবর আলাদা দুর্বলতা আছে। ‘সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস’ লুক তৈরি করাটা আমার সিগনেচার। আমার স্টেটমেন্ট পিসগুলো খুব বেশি চোখ-ধাঁধানো বা চটকদার নয়; বরং এগুলোতে একটি অ্যান্টিক পলিশ করা থাকে, যা গহনায় একটা মাটির কাছাকাছি বা ‘আর্দি’ আমেজ এনে দেয়।’’
বর্তমান বিশ্বের আলোচিত ‘স্লো ফ্যাশন’ বা টেকসই ফ্যাশনের একনিষ্ঠ অনুসারী অন্যা। গহনাকে টেকসই করতে এর ওপর গোল্ড বা সিলভার প্লেটিং করার পর একটি অ্যান্টিক কোটিং দেওয়া হয়, যা কাদম্বরীর গহনাগুলোকে বাজারের সাধারণ গহনা থেকে আলাদা করে। প্রতিটি হ্যান্ডক্রাফটেড গহনার পেছনে থাকে এ দেশীয় কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া।
অন্যা আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘কারিগরদের অসাধারণ হাতের কাজের জন্য আমার কল্পনা বাস্তব রূপ পায়। আমাদের দেশের কারিগরদের দক্ষতা সত্যি বিশ্বমানের। তবে তাদের এই অনবদ্য কাজগুলোকে আমি এখনও সেভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে পারিনি, যা আমার একটি বড় স্বপ্ন।’
উদ্যোগের নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি অন্যার প্রগাঢ় প্রেমের প্রতিফলন ঘটেছে। ঠাকুরবাড়ির কাদম্বরী দেবী–বাঙালি সংস্কৃতিতে যিনি একাধারে আভিজাত্য, শিল্পবোধ ও বিষাদের এক চিরন্তন প্রতীক। তাঁকে নিয়ে পড়ার পর অন্যার মনে গভীর কৌতূহল ও মুগ্ধতা তৈরি হয়। সেই ভালোলাগা থেকে নিজের ব্র্যান্ডের নাম রাখেন ‘কাদম্বরী’।
২০১৭ থেকে ২০২৬, ১০ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় ‘কাদম্বরী’র নকশায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এলেও, টেকসই ফ্যাশনের প্রশ্নে অন্যা শুরু থেকে আপসহীন। তিনি চান না কোনো গহনা একবার পরার পর আলমারিতে বাক্সবন্দি হয়ে থাকুক। তাঁর নকশা করা গহনাগুলো এতটাই বহুমুখী যে, তা শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ বা ওয়েস্টার্ন আউটফিটের সঙ্গেও সমানভাবে মানিয়ে যায়।
ছোট পরিসরে শুরু হওয়া কাদম্বরী আজ আর কোনো একক উদ্যোগ নেই। ক্রেতার ইনবক্স সামলানো, অর্ডার নেওয়া ও পণ্য সরবরাহের জন্য জন্য তৈরি হয়েছে একটি নারীনির্ভর ছোট দল। গহনা তৈরির জন্য রয়েছে নিজস্ব কারিগর প্যানেল। নিজস্ব শোরুম না থাকলেও গুলশান-১ এর আর্টপ্রুভের মাল্টিব্র্যান্ড কোশিয়ার স্পেসে রয়েছে কাদম্বরীর নিজস্ব ডিসপ্লে কর্নার।
- বিষয় :
- রিক্তা রিচি
- নারী উদ্যোক্তা