ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদিবাসীর ভূমি অধিকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব

সুশাসন

আদিবাসীর ভূমি অধিকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৭:৪৮ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৯:২৯

বাংলাদেশে ৩০ লাখ আদিবাসীর বসবাস। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামেই দেশের এক-তৃতীয়াংশ আদিবাসী বাস করে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ আদিবাসীর বাস সমতল ও উপকূল অঞ্চলে। আদিবাসীদের সিংহভাগ জনগণ এখনও জীবিকা নির্বাহের জন্য ভূমি ও বনের ওপর নির্ভরশীল। পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় দেশের জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয়, 'রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।' তার মানে 'উপজাতি' বা 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা', 'নৃ-গোষ্ঠী' যে নামেই ডাকা হোক, এটা সাংবিধানিকভাবে প্রমাণিত- বাংলাদেশ একক জাতিসত্তার রাষ্ট্র নয়।

আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি ভূমিকেন্দ্রিক। ১৯৬০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পাহাড়িদের ভূমিতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হয়েছিল। পরিণামে অনেক আদিবাসীকে ভূমি হারিয়ে আশ্রয় নিতে হয় ভারতে উদ্বাস্তু মানুষ হিসেবে। বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের ৪৮ কিলোমিটারে নাইতংপাহাড় সংলগ্ন কাপ্রুপাড়া, ইরাপাড়া, দোলাপাড়া, কলাইপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় কয়েকশ ম্রো পরিবার শত শত বছর ধরে বসবাস করছে। ২০২০ সালে একটি বাণিজ্যিক গ্রুপ সেখানে প্রায় ১০০০ একর ভূমি দখল করে বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের তৎপরতা চালায়। এ ছাড়া ভূমিদস্যুদের হাতে চলে গেছে দেবোত্তর সম্পত্তি কুয়াকাটা বৌদ্ধবিহার। তাঁতশিল্প, পুকুর, শ্মশান দখল হয়েছে। ৩০০ বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ ছয়আনিয়াপাড়া রাখাইন গ্রামটিও উচ্ছেদের সম্মুখীন।

ভূমির জন্য মধুপুরের সংরক্ষিত বন, সুন্দরবন, উত্তরাঞ্চল এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সংরক্ষিত বনের আদিবাসীরা, বান্দরবানের ম্রো, উপকূলের রাখাইন, খাসি নাহার পুঞ্জি, কাঁকড়া পুঞ্জিবাসীরা বিপন্ন বোধ করছে। এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত আদিবাসীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ র‌্যাটিফাই করে। এ কনভেনশনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু এ কনভেনশনের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে আইন বা নীতিমালা হয়নি এখনও। আদিবাসীদের ভূমির ওপর চিরায়ত প্রথা 'সমষ্টিগত মালিকানা' আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯-এ স্বীকৃতি পেয়েছে। আইএলও কনভেনশনের মূল কথা- আদিবাসীদের দলিল থাকুক বা না থাকুক, যে জমি ঐতিহ্যগতভাবে তারা ব্যবহার করে, সে জমি তাদের। বাংলাদেশ সরকার আইএলও কনভেনশন ১০৭-এ অনুস্বাক্ষর করেছে। সুতরাং সে অর্থে আদিবাসীদের কাগজবিহীন সমষ্টিগত ভূমি মালিকানার বিষয়টি দেশের আইনে পরিণত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংবিধানের ১৪৯ ধারায় বলা হয়েছে, 'এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে সব প্রচলিত আইনের কার্যকারিতা অব্যাহত থাকিবে।' সুতরাং যে বা যারা মধুপুরের বনে কাগজপত্রবিহীন ভূমিতে বাস করেন, বাগানবাগিচা করেন, সেই জমি বংশপরম্পরায় তাদের। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা এবং 'কমিউনিটি ওনারশিপ'-এর বিষয়টি আসা প্রয়োজন। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিতে এর স্বীকৃতি আছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে অ-আদিবাসীদের নিকট জমিজমা বিক্রয় বা অন্যবিধভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রেভিনিউ অফিসার পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে। সংবিধানে প্রথাগত ও সামাজিক মালিকানার বিষয়টিকে আনা জরুরি। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩ (গ)-তে মালিকানার নীতিতে তিন ধরনের কথা বলা হয়েছে : ১. রাষ্ট্রীয় মালিকানা, ২. সমবায় মালিকানা, ৩. ব্যক্তিমালিকানা। এখানে আদিবাসীদের 'সমষ্টিগত মালিকানা'র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে সামাজিকভাবে ভূমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

আদিবাসী ভূমি অধিকার সংরক্ষণে উল্লিখিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক সংসদীয় ককাস। ক. আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান, খ. সমতলের আদিবাসীদের জন্য অবিলম্বে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, গ. পাহাড়ের ভূমি কমিশনকে আরও কার্যকর করা, ঘ. বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আইন প্রণয়ন, ঙ. দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষা আইন কার্যকর করা। এ ছাড়া বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ এর কারণে আদিবাসীর আর্থিক অসচ্ছলতা ক্রমান্বয়ে প্রকট হচ্ছে। এ জন্য সমগ্র আদিবাসীর জন্য একটি বিশেষ প্যাকেজ কর্মসূচি প্রণয়ন জরুরি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং নারীদেরও কর্মসংস্থান করা প্রয়োজন। তাদের জীবনধারাকে প্রভাবিত করে এমন সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক নীতি, ফ্রি, প্রাইওর এবং ইনফর্মড কনসেন্ট পলিসি মেনে চলা জরুরি।

আদিবাসীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্র, বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী, মানবাধিকার সংগঠক, পাশাপাশি দেশের মূলধারার সব সংবেদনশীল মানুষকে সক্রিয় হতে হবে। আমাদের দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্টম্ন বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অপার সম্ভাবনার দেশে পরিণত হতে চললেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র দৃশ্যমান। মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীর অবদান চিরস্মরণীয়। তাদের অধিকার সুরক্ষায় সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

সাধারণ সম্পাদক, গবেষণা ও উন্নয়ন কালেকটিভ; যুগ্ম সমন্বয়ক, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক সংসদীয় ককাস

আরও পড়ুন

×